জাতীয়

বিমানে সাবেক এমডির সিন্ডিকেট এখনো বহাল!

স্টাফ রিপোর্টার

শেয়ারঃ

বিমানে সাবেক এমডির সিন্ডিকেট এখনো বহাল!

ছবি : সংগৃহীত

রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সে বিভিন্ন দেশে কান্ট্রি ম্যানেজার পদায়ন ঘিরে অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি ও প্রভাব বিস্তারের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও সিইও ড. সাফিকুর রহমানের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট এখনো সক্রিয় রয়েছে বলে দাবি করেছেন ভুক্তভোগী একাধিক কর্মকর্তা।


বেসামরিক বিমান ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ে দেওয়া লিখিত অভিযোগে বাদ পড়া কয়েকজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও মেধাকে পাশ কাটিয়ে পছন্দের প্রার্থীদের বিদেশি স্টেশনে কান্ট্রি ম্যানেজার হিসেবে বসানো হয়েছে। ২৮ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত মৌখিক পরীক্ষাকে ‘লোক দেখানো’ বলে অভিযোগ করেন তারা। ওই পরীক্ষায় ২৩ জন অংশ নিলেও সিনিয়র ও অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের বাদ দিয়ে অযোগ্যদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলে দাবি তাদের।

যুগান্তরের হাতে আসা তালিকা অনুযায়ী, গ্রাউন্ড সার্ভিস বিভাগের সহকারী ব্যবস্থাপক শামিমা পারভিনকে কুয়েত স্টেশনে ম্যানেজার পদে পদায়ন করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, ওই স্টেশনে আগে থেকেই কর্মরত তার স্বামী শাহজাহানের প্রভাবেই এই পদায়ন নিশ্চিত করা হয়। পদোন্নতির তালিকায় তার অবস্থান ছিল ২১ নম্বরে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে শামিমা পারভিন কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

অন্যদিকে চীনের গুয়াংজু স্টেশনে ম্যানেজার পদে পদায়ন নিয়ে ওঠে স্বজনপ্রীতির অভিযোগ। বিমানের সহযোগী প্রতিষ্ঠান বিএফসিসির ম্যানেজার আরিফুল ইসলামের ভাতিজা আশরাফুল হাসানকে সেখানে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ। সংশ্লিষ্টদের দাবি, চাচার প্রভাব খাটিয়েই এই নিয়োগ নিশ্চিত করা হয়।

এ ছাড়া সাবেক সিবিএ নেতা বেলাল হোসেনের ভাতিজা মনিরুল ইসলাম প্রধানকে যুক্তরাজ্যের ম্যানচেস্টার স্টেশনে পদায়নের অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগে বলা হয়, তদবিরের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ স্টেশন বাগিয়ে নেওয়া হয়েছে।

লিখিত অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, ইয়ারত হোসেনকে দিল্লি, তন্ময় কুমার সরকারকে শারজাহ এবং মিজানুর রহমানকে মদিনা বিমানবন্দরে নিয়মবহির্ভূতভাবে পদায়ন করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, প্রভাব খাটিয়ে এমন পদায়ন প্রতিষ্ঠানটির স্বচ্ছতা ও ন্যায্যতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কর্মকর্তা জানান, গত বছরের মে-জুনে হওয়ার কথা থাকলেও পদায়ন প্রক্রিয়া বিভিন্ন অজুহাতে ডিসেম্বর পর্যন্ত পিছিয়ে দেওয়া হয়। তাদের দাবি, সাবেক এমডি ড. সাফিকুর রহমানের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহযোগিতায় একটি চক্র এসব নিয়ন্ত্রণ করেছে। একই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক কেবিন ক্রু নিয়োগেও আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)–এর নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, যোগ্যতা ও মেধাকে উপেক্ষা করে স্বজনপ্রীতি ও আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানে গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ গুরুতর প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির শামিল। লোক দেখানো মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে এমন পদায়নকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা সুশাসনের মৌলিক নীতির লঙ্ঘন। তিনি অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্য তদন্তের দাবি জানান।

বিমানের মহাব্যবস্থাপক (জনসংযোগ) বোশরা ইসলাম বলেন, স্টেশন নির্বাচন মূলত এমডির এখতিয়ারভুক্ত। অনেক ক্ষেত্রে বোর্ডসভায় আলোচনা সাপেক্ষে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। যদি কোনো ব্যত্যয়ের অভিযোগ থাকে, তা তদন্তসাপেক্ষ। তদন্তে অনিয়ম প্রমাণিত হলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বর্তমানে সাবেক এমডি কারাগারে রয়েছেন। তার দায়িত্বকালে কোনো অনিয়ম হয়ে থাকলে তদন্তের মাধ্যমে তা নির্ধারণ করা হবে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

তবে অভিযোগকারীদের দাবি, সিন্ডিকেটভিত্তিক নিয়োগ প্রক্রিয়া বন্ধ না হলে প্রতিষ্ঠানটির ভাবমূর্তি ও প্রশাসনিক শৃঙ্খলা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তারা বিতর্কিত সব পদায়ন বাতিল করে যোগ্য ও মেধাবী কর্মকর্তাদের নিয়োগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।


সম্পর্কিত খবর