আন্তর্জাতিক
এফ-৩৫ স্টিলথ যুদ্ধবিমানে আঘাত,প্রশংসায় ভাসছে ইরান

ছবি : সংগৃহীত
যুক্তরাষ্ট্রের বিমান বাহিনীর একটি এফ-৩৫ লাইটনিং-২ যুদ্ধবিমানকে সফলভাবে লক্ষ্যবস্তু করেছে ইরান, যা বিশ্বের উন্নত স্টিলথ ফাইটার জেট হিসেবে পরিচিত। এর মাধ্যমে বৃহস্পতিবার (১৯ মার্চ) বিশ্বের সামরিক মহলে ব্যাপক চাঞ্চল্য ছড়িয়ে দিয়েছে ইরানি সশস্ত্র বাহিনী।
মার্কিন আধুনিক আকাশ যুদ্ধের ইতিহাসে এটি একটি সম্ভাব্য মোড় হিসেবে দেখা হচ্ছে এবং শক্তিশালী ও উদ্ভাবনী প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে স্টিলথ প্রযুক্তির কার্যকারিতা নিয়ে তীব্র বিতর্কেরও সৃষ্টি করেছে। সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, ইতিহাসে এই প্রথম কোনো এফ-৩৫ জেট আক্রান্ত হলো।
প্রথম খবরটি একটি ওপেন সোর্স অ্যাকাউন্ট থেকে আসে, যেখানে বলা হয় একটি এফ-৩৫এ/বি লাইটনিং-২ ইরানি ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে ‘জরুরি অবতরণ’ করেছে। পরবর্তীতে মার্কিন সেন্টকমের নেভি ক্যাপ্টেন টিম হকিন্স 'মিলিটারি টাইমস'-কে দেওয়া এক বিবৃতিতে বলেন, ‘ইরানের ওপর একটি কমব্যাট মিশন শেষে যুক্তরাষ্ট্রের একটি এফ-৩৫ বিমান আঞ্চলিক মার্কিন বিমানঘাঁটিতে জরুরি অবতরণ করেছে—এমন খবর সম্পর্কে আমরা অবগত।’
বৃহস্পতিবার (১৯ মার্চ) থেকে এই বড় ধরনের ঘটনাটি মার্কিন সামরিক-শিল্প কমপ্লেক্সকে নাড়িয়ে দিয়েছে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলো এ নিয়ে সরগরম।
বিশেষ করে এফ-৩৫ প্রোগ্রামের আকাশচুম্বী খরচ এবং এটি ভূপাতিত করার সস্তা উপায়ের মধ্যে আকাশ-পাতাল পার্থক্য নিয়ে আলোচনা চলছে।
বিশ্লেষক উইল শ্রাইভার বলেন, সেন্টকম স্বীকার করেছে যে ইরানিরা তাদের আকাশসীমায় উড়ন্ত একটি এফ-৩৫-কে সফলভাবে লক্ষ্যবস্তু এবং ‘ক্ষতিগ্রস্ত’ করেছে।
সেন্টকম বিমানটির জরুরি অবতরণ এবং পাইলটের স্থিতিশীল অবস্থার দাবি করলেও শ্রাইভার এ নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন। তিনি ইরানের ভিডিও ফুটেজের কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘সেখানে স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতের পর জেটের পেছনে আগুনের শিখা দেখা যাচ্ছে।’
ব্র্যান্ডন উইকার্ট নামে এক সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারী এই বৈষম্য তুলে ধরে বলেন, ‘এফ-৩৫ প্রোগ্রামকে সর্বকালের সবচেয়ে উন্নত স্টিলথ ফাইটার হিসেবে প্রচার করা হয়েছিল। ২০ বছরে আমাদের ২ ট্রিলিয়ন ডলার খরচ হয়েছে। অথচ পেন্টাগন বারবার যে সামরিক বাহিনীকে 'সম্পূর্ণ পরাজিত' বলে দাবি করেছে, তাদের একটি ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতেই এটি ক্ষতিগ্রস্ত হলো।’
গান্ডালভ নামে এক ব্যবহারকারী এর মনস্তাত্ত্বিক এবং কৌশলগত প্রভাব নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে বলেন, এফ-৩৫ ছিল আমেরিকার একটি থিওলজিক্যাল স্টেটমেন্ট বা দম্ভ—যা দিয়ে তারা বোঝাতে চেয়েছিল যে আমরা তোমাদের ক্ষেপণাস্ত্র, সেন্সর এবং প্রার্থনার নাগালের বাইরে চলে গেছি। ইরান সম্ভবত সেই বার্তাটি পায়নি।
তিনি আরও জানান, এফ-৩৫-এর নিজস্ব শক্তিশালী ইঞ্জিনের কারণে এটি ইনফ্রারেড সেন্সরের কাছে অত্যন্ত সহজলভ্য। তিনি বলেন, ইরান এখন এই বিমানের যে হিট সিগনেচার ডাটা পেয়েছে তা কেবল লজ্জাজনকই নয়, এটি মস্কো এবং বেইজিংয়ের জন্য এক অমূল্য উপহার।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আলোচনায় আরেকটি বিষয় বারবার উঠে এসেছে—কোন ব্যবস্থার মাধ্যমে এটি আক্রান্ত হয়েছে।
ফ্রান্সিস গাইথো জোর দিয়ে বলেন, এটি কোনো রুশ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নয়, বরং সম্পূর্ণ ইরানি প্রযুক্তিতে তৈরি ব্যবস্থার মাধ্যমে ওই 'স্টিলথ' এফ-৩৫-কে শনাক্ত ও আঘাত করা হয়েছে।
রাজু পারুলেকারও একই সুর মিলিয়ে বলেন, ‘ইরান বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে ১৯ কোটি ডলারের মার্কিন পঞ্চম প্রজন্মের স্টিলথ এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান মাত্র ৩ হাজার ডলারের নিজস্ব প্রযুক্তির ইরানি আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দিয়ে ভূপাতিত করেছে।’
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন এর প্রভাব কেবল একটি বিমান হারানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়।
ড. সৈয়দ মোহাম্মদ মুর্তজা জানান, এই সফল অভিযান ইরানকে অমূল্য তথ্য দিয়েছে। তিনি বলেন, আইআরএসটি লকের মাধ্যমে এফ-৩৫-এর হিট ডিটেকশন রেঞ্জ পাওয়া গেছে... এই ইনফ্রারেড ফিঙ্গারপ্রিন্ট এখন ইরানের কাছে একটি অমূল্য রেকর্ড। এটি বন্ধু রাষ্ট্রগুলোর কাছেও পৌঁছাবে এবং এই বিমান শনাক্ত ও লক্ষ্যবস্তু করার সেন্সর তৈরিতে সাহায্য করবে।
তিনি আরও মন্তব্য করেন, এখন থেকে এফ-৩৫ পাইলটরা ‘রক্ষনাত্মকভাবে’ বিমান চালাবেন, কারণ তারা আর ‘অদৃশ্য’ নন।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বিশ্লেষক শায়েল বেন-এফ্রাইম মার্কিন আকাশসীমার শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি বলেন, এই ঘটনা এফ-৩৫-এর স্টিলথ ক্ষমতার পরাজয়সহ অনেক বিষয়ে প্রশ্ন তোলে। তিনি একটি উদ্বেগের পরিসংখ্যান তুলে ধরে বলেন, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে অন্তত ১৬টি মার্কিন সামরিক বিমান হারানো গেছে বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ওমর খৈয়াম নামে একজন ব্যবহারকারী মাত্র বিশ দিনে মার্কিন ক্ষয়ক্ষতির একটি তালিকা দিয়ে এই সামগ্রিক প্রভাব সংক্ষেপে তুলে ধরেন: ‘২টি এফ-৩৫ স্টিলথ ফাইটার আক্রান্ত, ৪টি এফ-১৫ স্ট্রাইক ঈগল হারানো গেছে, ৭টি কেসি-১৩৫ স্ট্র্যাটো ট্যাঙ্কার ক্ষতিগ্রস্ত (একটি ধ্বংস) এবং ১০টি অত্যন্ত ব্যয়বহুল রাডার সিস্টেম অকেজো হয়ে গেছে।’
সূত্র: প্রেস টিভি।







