জাতীয়

মালয়েশিয়ায় শ্রমিক পাঠানো সিন্ডিকেটের সদস্য হতে দিতে হতো ১০ কোটি টাকা

স্টাফ রিপোর্টার

শেয়ারঃ

মালয়েশিয়ায় শ্রমিক পাঠানো সিন্ডিকেটের সদস্য হতে দিতে হতো ১০ কোটি টাকা

ছবি : সংগৃহীত

মালয়েশিয়ায় লোক পাঠানোর নামে হাজার হাজার কোটি টাকা চাঁদাবাজি হয়েছে। নেপথ্যে ছিল ১৫ জনের প্রভাবশালী সিন্ডিকেট। গডফাদার ছিলেন সাবেক প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সাবেক মন্ত্রী ইমরান আহমেদ, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপেদষ্টা সালমান এফ রহমান এবং সাবেক অর্থমন্ত্রী আ ফ ম মোস্তফা কামাল ওরফে লোটাস কামালসহ সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের কিছু ব্যক্তি।


রিক্রুটিং এজেন্সি মেসার্স ইউনাইটেড এক্সপোর্ট লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এস এম রফিক এ বিষয়ে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়ে সব ফাঁস করে দিয়েছেন।

সূত্রমতে সাবেক মন্ত্রী ইমরান, সাবেক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান এবং সাবেক মন্ত্রী লোটাস কামাল ছাড়াও সিন্ডিকেটের অন্য সদস্যরা হলেন- লে. জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী, আমি ওরফে দাতু আমিন, রুহুল আমিন স্বপন, সাবেক এমপি আলাউদ্দিন নাসিম, নিজাম হাজারী, সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ, ড. মনিরুস সালেহীন ও নূর আলী প্রমুখ। এই সিন্ডিকেটের সদস্য হতে গেলে শুরুতেই দিতে হতো ১০ কোটি টাকা। এই টাকা উঠাতেন মাসুদ উদ্দিন, রুহুল আমিন স্বপন, আমিনুল ইসলাম বিন আব্দুল নুর, আবুল বাসার নুর আলী ও দাতু আমিন।


সূত্র জানায়, কেবল অতিরিক্তি টাকা আদায় করেই ক্ষান্ত ছিলেন না চক্রের সদস্যরা। তারা খুলেছিলেন ‘আমি প্রবাসী’ নামের একটি অ্যাপ। এই অ্যাপের কোনো সরকারি অনুমোদন না থাকলেও যারা মালয়েশিয়া যেতে আগ্রহ দেখাতেন তাদের সবাইকে ওই অ্যাপে নিবন্ধন করতে হতো। এ ক্ষেত্রে নেওয়া হতো ৫০০ থেকে এক হাজার টাকা। এভাবে ফি দিয়ে প্রায় এক কোটি লোক নিবন্ধন করেছেন বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। এছাড়া কোভিড টেস্ট, পাসপোর্ট খরচ ও মেডিকেল চেকআপসহ নানা বাহানায় নেওয়া হতো মোটা অঙ্কের অতিরিক্ত টাকা। এ বিষয়ে রিক্রুটিং এজেন্সি মেসার্স ইউনাইটেড এক্সপোর্ট লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এস এম রফিক (মামলার আসামি) আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেছেন।


আদালতে ১৬৪ ধারায় দেওয়া জবানবন্দিতে এসএম রফিক বলেন, রুহুল আমিন স্বপন, নূর আলী, আমিনুল ইসলাম বিন আব্দুল নুর, মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী, নিজাম হাজারী, আলাউদ্দিন নাসিম এবং বাসেদসহ বেশ কয়েকজন ছিল মালয়েশিয়ায় লোক পাঠানো নেপথ্যের কারিগর। শেখ হাসিনার জ্ঞাতসারে তারা স্মার্ট বাংলাদেশ নামক প্রযুক্তি ব্যবহার করে সাধারণ মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করে হাতিয়ে নিয়েছেন হাজার হাজার কোটি টাকা। যারা খুবই ব্যাপকভাবে চাঁদাবাজি করতেন।


আমার এজেন্সির মাধ্যমে মালয়েশিয়ার লোক পাঠানোর সময় রুহুল আমিন স্বপনকে প্রথম ধাপে দুই লাখ ও দ্বিতীয় ধাপে দেড় লাখ করে চাঁদা দিতে হতো (এ বিষয়ে তেজগাঁও থানায় একটি সাধারণ ডায়েরিও করেছি)। অথচ মালয়েশিয়ায় লোক পাঠানোর ক্ষেত্রে সরকার নির্ধারিত ফি ছিল ৭৮ হাজার ৯৯০ টাকা। অতিরিক্ত চাঁদা পরিশোধ করার পর টাকা দেওয়া হয়নি অভিযোগ তুলে মাঝেমধ্যে পাসপোর্ট আটকে দিয়ে হয়রানি করা হতো। এমনকি লাইসেন্স ব্লক করে দেওয়া হতো।


নির্ধারিত ফি এবং অতিরিক্ত চাঁদার টাকার বাইরে পাসপোর্ট খরচ বাবদ ১০ হাজার, কোভিড-১৯ টেস্ট বাবদ ১৭ হাজার, মেডিকেল খরচ বাবদ ৬ হাজার ৫০০ এবং পোশাক খরচ বাবদ তিন হাজার টাকা করে নিতেন চক্রের সদস্যরা। অথব সব খরচই বহন করার কথা সরকারি ফি’র ৭৮ হাজার ৯৯০ টাকার মধ্য থেকে। এই অপকর্মের বিরুদ্ধে তৎকালীন সরকারের উচ্চ পর্যায়ে অভিযোগ করেও কোনো সুরাহা পাওয়া যায়নি। এ কারণে বিষয়টি নিয়ে আমি হাইকোর্টে রিট করি। অভিযোগটি আমলে নিয়ে আদালত ৯০ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে দুর্নীতি দমন কমিশন এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের মানি লন্ডারিং শাখাকে নির্দেশ দেন।


সম্পর্কিত খবর