আন্তর্জাতিক

যুদ্ধবিরতি ভেস্তে দিতে পারে লেবাননে ইসরাইলি হত্যাযজ্ঞ

আল আরাবিয়া।

শেয়ারঃ

যুদ্ধবিরতি ভেস্তে দিতে পারে লেবাননে ইসরাইলি হত্যাযজ্ঞ

ছবি : সংগৃহীত

ইরানে ৪০ দিনের আগ্রাসন বন্ধ করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করলেও তা বাস্তবায়ন নিয়ে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। সংঘাত থামায় মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ফেরার প্রত্যাশ্যা করা হলেও লেবাননজুড়ে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালাচ্ছে ইসরাইল—যা কার্যকর হওয়ার ৪৮ ঘণ্টারও কম সময়ের মধ্যে নাজুক এ যুদ্ধবিরতিকে নাড়িয়ে দিয়েছে।

তিন শতাধিক মানুষের প্রাণহানির পর বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) জাতীয় শোক দিবস ঘোষণা করেছে বৈরুত।


ওয়াশিংটন ও তেহরান উভয়ই দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি এবং আলোচনা চুক্তিতে সম্মত হওয়ার পর নিজেদের বিজয় দাবি করেছে। এই আলোচনা মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে হাজারো মানুষের প্রাণহানি ঘটানো এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি করা যুদ্ধের অবসান ঘটানোর লক্ষ্যে ছিল।

তবে চুক্তির দুর্বলতা দ্রুতই প্রকাশ পায় বুধবার (৮ এপ্রিল), যখন ইসরাইল প্রতিবেশী লেবাননে সবচেয়ে নৃশংস হামলা চালায়। আক্রান্ত এলাকার মধ্যে ঘনবসতিপূর্ণ কেন্দ্রীয় বৈরুত এলাকাও ছিল—যা ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ মার্চের শুরুতে যুদ্ধে যোগ দেওয়ার পর থেকে সবচেয়ে বড় হামলা।

ইসরাইল বলেছে, লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে হামলা যুদ্ধ যুদ্ধবিরতির অংশ নয়—এই অবস্থানকে সমর্থন করেছেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স, যিনি পাকিস্তানে তেহরানের সঙ্গে আলোচনার নেতৃত্ব দেওয়ার কথা রয়েছে।


তিনি বলেন, ইরান যদি লেবানন নিয়ে—যার সঙ্গে তাদের কোনো সম্পর্ক নেই এবং যা কখনোই যুদ্ধবিরতির অংশ হিসেবে বলা হয়নি—এই আলোচনা ভেঙে দিতে চায়, তাহলে সেটি তাদের সিদ্ধান্ত।


তবে ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ যুদ্ধবিরতি নিয়ে হুমকি সূচক মন্তব্য করেন। তিনি এক্সে লিখেছেন, আলোচনার কার্যকরের ভিত্তি ইতোমধ্যেই লঙ্ঘিত হয়েছে, ফলে আরও আলোচনা ‘অযৌক্তিক’ হয়ে উঠেছে।

গালিবাফ যুক্তরাষ্ট্রের তিনটি কথিত লঙ্ঘনের কথা উল্লেখ করেন, লেবাননে হামলা অব্যাহত রাখা, ইরানের আকাশসীমায় ড্রোন প্রবেশ এবং ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার অধিকার অস্বীকার।

যুদ্ধবিরতির ভঙ্গুরতা আরও বেড়েছে—যা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নির্ধারিত সময়সীমার কয়েক ঘণ্টা আগে সম্মত হয়েছিল—যখন এক মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, ইরানের ১০ দফা পরিকল্পনা হোয়াইট হাউসের সম্মত শর্তগুলোর সঙ্গে পুরোপুরি মেলে না।

লেবাননে, যেখানে জাতিসংঘের মানবাধিকার প্রধান ভলকার তুর্ক হত্যাকাণ্ডের মাত্রাকে ‘ভয়াবহ’ বলেছেন, কোনো সতর্কতা ছাড়াই রাজধানী বৈরুতজুড়ে হামলা ভয় ও আতঙ্কের দৃশ্য সৃষ্টি করেছে।


একজন প্রত্যক্ষদর্শী আলি ইউনেস বলেন, মানুষ এদিক-সেদিক দৌড়াতে শুরু করে, আর চারদিকে ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ছিল, তিনি কর্নিশ আল-মাজরার কাছে তার স্ত্রীর জন্য অপেক্ষা করছিলেন—যা হামলার লক্ষ্যবস্তু এলাকাগুলোর একটি।

স্থানীয় কর্মকর্তাদের মতে, গত মাসে ইসরাইল বিমান ও স্থল হামলা শুরু করার পর থেকে লেবাননে ১ হাজার ৭০০-এর বেশি মানুষ নিহত হয়েছে।

ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) সতর্ক করে বলেছে, ইসরাইল যদি হামলা বন্ধ না করে, তাহলে তারা ‘তাদের দায়িত্ব পালন করবে এবং জবাব দেবে।’

অন্যদিকে হিজবুল্লাহ বলেছে, তাদের প্রতিক্রিয়া জানানোর ‘অধিকার’ রয়েছে।


ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু বলেছেন, প্রয়োজন হলে তারা ইরানের মোকাবিলায় প্রস্তুত রয়েছে, কারণ এখনো তাদের ‘কিছু লক্ষ্য পূরণ করা বাকি আছে।’

সামরিক বাহিনী জানায়, তারা লেবাননে হিজবুল্লাহকে ‘নিরস্ত্র’ করার লক্ষ্য অর্জনে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।

পেন্টাগনের প্রধান পিট হেগসেথও বলেছেন, সংঘাত আবার বেড়ে গেলে মার্কিন বাহিনী প্রস্তুত রয়েছে।

উচ্চঝুঁকির আলোচনা


শুক্রবার বা শনিবার পাকিস্তানে সম্ভাব্য গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হওয়ার আগে এই উত্তেজনাপূর্ণ বক্তব্যগুলো এসেছে।

এর আগে ট্রাম্পের কঠোর হুমকির মুখে ইরান সাময়িকভাবে হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে সম্মত হয়েছিল, এবং বুধবার সীমিতসংখ্যক জাহাজ এই কৌশলগত পানিপথ দিয়ে চলাচল করেছে।

বৃহস্পতিবার ইরান বিকল্প নৌপথ ঘোষণা করেছে, কারণ প্রধান নৌপথে সামুদ্রিক মাইনের ঝুঁকি রয়েছে—এই সরু জলপথ দিয়ে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল পরিবাহিত হয়।

তবে তেহরান আদৌ জাহাজ চলাচলের অনুমতি দিচ্ছে কিনা তা স্পষ্ট নয়, কারণ বুধবার কিছু প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল যে প্রণালিটি বন্ধ ছিল—যা হোয়াইট হাউস ‘সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য’ বলে মন্তব্য করেছে।


পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ, যার দেশ এই যুদ্ধবিরতিতে মধ্যস্থতা করেছে, এক্সে সব পক্ষকে ‘সংযম প্রদর্শন এবং দুই সপ্তাহের জন্য যুদ্ধবিরতি মেনে চলার’ আহ্বান জানিয়েছেন, যাতে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা এগিয়ে যেতে পারে।

যুদ্ধবিরতির স্থায়িত্ব নিয়ে আরও সন্দেহ তৈরি করে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম, যারা জানায় যে তেল স্থাপনায় হামলার প্রতিশোধ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র উপসাগরীয় দেশগুলোর বিরুদ্ধে নতুন করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে। কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব ও বাহরাইন যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে হামলার কথা জানিয়েছে।

তবে গত কয়েক ঘণ্টায় অঞ্চলের অন্য দেশগুলোতে নতুন হামলার কোনো খবর পাওয়া যায়নি।


তেহরানে বুধবার স্বাভাবিকের তুলনায় রাস্তাঘাট শান্ত ছিল, অনেক দোকানপাট বন্ধ ছিল—যুক্তরাষ্ট্রের বড় ধরনের হামলার আশঙ্কায় বাসিন্দারা দীর্ঘ ও উদ্বেগপূর্ণ রাত কাটানোয়।

৫০ বছর বয়সী গৃহিণী সাকিনেহ মোহাম্মাদি বলেন, এখন সবাই স্বস্তিতে আছে এবং তিনি তার দেশের জন্য ‘গর্বিত’ বলে জানান।

তিনি বলেন, আমরা এখন অনেকটাই স্বস্তিতে আছি।


বুধবার ইউরোপের কয়েকটি দেশ, কানাডা ও যুক্তরাজ্যের নেতারা বলেছেন, যুদ্ধের দ্রুত ও স্থায়ী সমাপ্তি নিশ্চিত করতে আলোচনা জরুরি।

পোপ লিওও এটিকে বাস্তব আশার মুহূর্ত হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

তবে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এবং হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ নিয়ন্ত্রণ নিয়ে তেহরানের দাবিগুলো এখনো যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানের সঙ্গে গভীরভাবে বিরোধপূর্ণ রয়ে গেছে।


সূত্র: আল আরাবিয়া।


সম্পর্কিত খবর