জাতীয়
বিমানের কুয়েত স্টেশনে অভিনব উপায়ে চলছে লুটপাট

ছবি : সংগৃহীত
অতিরিক্ত ব্যাগেজের আড়ালে রাজস্ব লুটের মহোৎসব চলছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সে। কুয়েতের স্টেশনে কর্মরত কর্মকর্তারা অর্থের বিনিময়ে কিছু কিছু যাত্রীকে শত শত কেজি অতিরিক্ত মালামাল বহনের সুযোগ করে দিচ্ছেন। এর ফলে রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার। লাভবান হচ্ছেন ওই অসাধু কর্মকর্তারা।
আবার ওজন কম দেখিয়ে লোড শিট বিকৃতির কারণে ঝুঁকির মুখে পড়ছে ফ্লাইটের নিরাপত্তা। সম্প্রতি কুয়েত থেকে ঢাকাগামী একটি ফ্লাইটে নিরাপত্তা বিভাগের ঝটিকা তদন্তে এমন অভিনব দুর্নীতির চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে আসে।
তদন্তে ১৪ জন যাত্রীর ব্যাগেজ তল্লাশি করে অতিরিক্ত ওজনের ব্যাগেজ পাওয়া গেছে ১২ জনের। যাদের ক্ষেত্রে কোনো সরকারি ফি আদায় হয়নি বা রসিদও ইস্যু হয়নি। বিমানের কুয়েত স্টেশনে সিন্ডিকেট করে এমন দুর্নীতির ঘটনা ঘটছে বলে জানা যায়।
২৩ জানুয়ারি কুয়েত থেকে ঢাকাগামী বিজি-৩৪৪ ফ্লাইটে যাত্রী ছিলেন প্রায় ১৭৩ জন। তাদের মধ্যে মাত্র ১৪ জন যাত্রীর ব্যাগেজ তল্লাশিতে যে তথ্য বেরিয়ে আসে, তা রীতিমতো হইচই ফেলে দেয়। নড়েচড়ে বসে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ। শুরু হয় অধিকতর তদন্ত।
এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদুল আলম বলেন, বিদেশি স্টেশনগুলোয় ব্যাগেজ বাণিজ্য এখন ‘ওপেন সিক্রেট’। চেক-ইন কাউন্টারে সরাসরি অর্থ গ্রহণ করা হলেও এর বিপরীতে কোনো সরকারি রসিদ না দেওয়া দুর্নীতি। ওই অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা না হয়ে স্টেশন ম্যানেজার থেকে শুরু করে দায়িত্বরত কর্মকর্তারা ভাগবাঁটোয়ারা করে নিচ্ছেন। তিনি আরও বলেন, লোড শিটে প্রকৃত ওজন কম দেখানো হলে উড্ডয়ন ও অবতরণের সময় উড়োজাহাজ বড় ধরনের দুর্ঘটনার ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।
ঢাকাগামী কুয়েতের ফ্লাইটের যাত্রীদের অতিরিক্ত ব্যাগেজ সংক্রান্ত অভ্যন্তরীণ অনিয়মের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করতে বিমানের নিরাপত্তা বিভাগের ডিজিএম মেজর ফারহান তানভীর ২৩ জানুয়ারি ঝটিকা তদন্ত করেন। এর দুদিন পর তিনি বিমানের এমডির কাছে এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন।
প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা যায়, কুয়েত থেকে আসা বিমানের ফ্লাইট বিজি-৩৪৪ হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণের পর নিরাপত্তা বিভাগ বেল্টে থাকা ১৪ জন যাত্রীর লাগেজ তল্লাশি করে। এতে দেখা যায়, ১২ জন যাত্রী নির্ধারিত সীমার অতিরিক্ত পণ্য বহন করেছেন। কিন্তু অতিরিক্ত ব্যাগেজের জন্য তাদের কাছে প্রযোজ্য ফি আদায় দেখানো হয়নি। কোনো যাত্রীর কাছ থেকে অতিরিক্ত ওজন বহনের জন্য সরকারি ফি পরিশোধের রসিদও পাওয়া যায়নি।
শুধু একটি ফ্লাইট থেকেই কয়েক লাখ টাকা রাজস্ব হারিয়েছে বিমান। এভাবে শত শত কেজি অতিরিক্ত ব্যাগেজের বিপরীতে রাজস্ব আদায় না হওয়ার ঘটনায় স্টেশনের কর্মকর্তারা ছাড়া আরও কারা জড়িত, অধিকতর তদন্তের কথা বলেছে কমিটি।
তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, বর্তমানে বিমানের কুয়েত স্টেশন ম্যানেজার হিসাবে দায়িত্ব পালন করছেন মো. শাজাহান (পি-৩৬৪৮৯)। তিনি একা নন। তার স্ত্রী শামিমা পারভিনও ওই স্টেশনে কর্মরত আছেন। তাকে গ্রাউন্ড সার্ভিস বিভাগে সহকারী ব্যবস্থাপক হিসাবে পদোন্নতি দিয়ে ফেব্রুয়ারিতে কুয়েত স্টেশনেই ম্যানেজার পদে পদায়ন করা হয়েছে। প্রভাব খাটিয়ে স্ত্রীকে পদোন্নতি দিয়ে একই স্টেশনে পদায়নের পেছনে ব্যক্তিস্বার্থ কাজ করেছে বলে মনে করছেন অনেকেই। একই স্টেশনে স্বামী-স্ত্রীর যৌথ দায়িত্ব পালনের ঘটনা বিমানে নজিরবিহীন।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে মো. শাজাহান বলেন, আমি এখন নামাজে যাচ্ছি, পরে কথা বলব। পরে ফোনে কল করলে তিনি বলেন, এ বিষয়ে আমি কিছু জানি না। আপনার কিছু জানার থাকলে অফিসে কথা বলুন।
সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা জানান, কুয়েতের স্টেশন ঘিরে দীর্ঘদিন ধরেই নানা অনিয়ম ও অবৈধ কর্মকাণ্ডের অভিযোগ রয়েছে। অতিরিক্ত ব্যাগেজ ও কার্গো ব্যবস্থাপনায় অনিয়মের মাধ্যমে সেখানে অবৈধ লেনদেনের ঘটনা ঘটছে।
বিমানের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা যুগান্তরকে জানান, বিদেশি স্টেশনগুলোয় কর্মরত কিছু কর্মকর্তা এই অনিয়মের সঙ্গে জড়িত। অতিরিক্ত ব্যাগেজের বিপরীতে আদায়কৃত অর্থ বিমানের কোষাগারে জমা না দিয়ে নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করে নেন। চেক-ইন কাউন্টারে গোপনে লেনদেনের মাধ্যমে এই অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান যুগান্তরকে বলেন, সাধারণ যাত্রীদের ১-২ কেজি বেশি ওজনের জন্য জরিমানা গুনতে হয়। অথচ একটি ফ্লাইটে শত শত কেজি অতিরিক্ত ব্যাগেজ আনা হয়েছে কোনো ফি পরিশোধ ছাড়াই। এটা প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি। এসব অসাধু কর্মকর্তার কারণেই বিমান লোকসানে থাকে। এর পেছনে আর কারা জড়িত, খুঁজে বের করে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে। তিনি বলেন, অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি ও রাজস্ব ফাঁকি বন্ধ না হলে সংস্থাটির আর্থিক ঘাটতি কখনোই পূরণ হবে না।
বিমানের জনসংযোগ মহাব্যবস্থাপক বোসরা ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, এ ঘটনায় অধিকতর তদন্তের জন্য ২৩ ফেব্রুয়ারি একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তবে তদন্তে এখন পর্যন্ত কী পাওয়া গেছে, তা তাৎক্ষণিকভাবে জানাতে পারেননি তিনি। বলেন, দুই দিন পর বিস্তারিত জেনে জানাব। কারও সংশ্লিষ্টতা প্রমাণিত হলে তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পাশাপাশি স্বামী-স্ত্রী একই স্টেশনে কর্মরত থাকার সুযোগ নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, নিয়মানুযায়ী একজনকে ফিরিয়ে আনা হবে এবং পরবর্তী সময়ে শামিমা পারভিন সেখানে যোগ দেবেন।







