ধর্ম
ইসলামে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার সঠিক বয়স ও লক্ষণ

ছবি : সংগৃহীত
ইসলাম মানুষের জীবনের প্রতিটি ধাপের জন্য সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা দিয়েছে। শিশুকাল থেকে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া পর্যন্ত একজন মানুষের দায়িত্ব, কর্তব্য ও ধর্মীয় বিধান ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হয়। যখন কোনো ছেলে বা মেয়ে প্রাপ্তবয়স্ক হয়, তখন তার ওপর নামাজ, রোজা, পর্দা, হালাল-হারাম মেনে চলাসহ বিভিন্ন শরিয়তসম্মত দায়িত্ব ফরজ হয়ে যায়।
তাই ইসলামে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার বয়স ও আলামত জানা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শরিয়ত ছেলে ও মেয়েদের জন্য কিছু নির্দিষ্ট লক্ষণ নির্ধারণ করেছে, যেগুলো প্রকাশ পেলেই তারা বালেগ বা প্রাপ্তবয়স্ক হিসেবে গণ্য হবে। আর যদি এসব আলামত প্রকাশ না পায়, তাহলে নির্দিষ্ট বয়সসীমার ভিত্তিতে তাদের প্রাপ্তবয়স্ক ধরা হবে।
ছেলে শিশুদের প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার আলামত
ইসলামে ছেলে শিশুদের বালেগ হওয়ার কয়েকটি স্পষ্ট লক্ষণ রয়েছে। নিচের যেকোনো একটি আলামত প্রকাশ পেলেই তাকে প্রাপ্তবয়স্ক গণ্য করা হবে—
১. স্বপ্নদোষ হওয়া
ঘুমের মধ্যে বীর্যপাত হওয়া ছেলে শিশুর বালেগ হওয়ার অন্যতম প্রধান আলামত।
২. অন্য কোনোভাবে বীর্যপাত হওয়া
জাগ্রত অবস্থায় অন্য কোনো কারণে বীর্যপাত হলেও সে প্রাপ্তবয়স্ক হিসেবে গণ্য হবে।
৩. দাড়ি-মোঁচ গজানো
দাড়ি বা গোঁফ ওঠাও প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার একটি লক্ষণ হিসেবে বিবেচিত।
মেয়ে শিশুদের প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার আলামত
মেয়েদের ক্ষেত্রেও শরিয়ত কয়েকটি স্পষ্ট আলামত নির্ধারণ করেছে। যেকোনো একটি প্রকাশ পেলেই তাকে বালেগ ধরা হবে—
১. স্বপ্নদোষ হওয়া
মেয়েদেরও স্বপ্নদোষ হতে পারে, যা প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার আলামত।
২. হায়েজ বা মাসিক শুরু হওয়া
মাসিকের রক্ত আসা মেয়েদের বালেগ হওয়ার সবচেয়ে পরিচিত লক্ষণ।
৩. গর্ভধারণ করা
গর্ভধারণ করাও প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার সুস্পষ্ট প্রমাণ।
আলামত প্রকাশ না পেলে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার বয়স
কখনো কখনো কোনো ছেলে বা মেয়ের মধ্যে উল্লিখিত আলামতগুলো প্রকাশ পায় না। সে ক্ষেত্রে শরিয়ত বয়সের ভিত্তিতে তাদের প্রাপ্তবয়স্ক গণ্য করে। হিজরি বর্ষ অনুযায়ী ১৫ বছর পূর্ণ হলে ছেলে-মেয়ে উভয়কেই শরিয়তে বালেগ বা প্রাপ্তবয়স্ক ধরা হয়। এরপর থেকে তার ওপর ইসলামের ফরজ বিধানসমূহ প্রযোজ্য হয়ে যায়।
হাদিসের আলোকে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার বয়স
عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عُمَرَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمَا قَالَ: عُرِضْتُ عَلَى النَّبِيِّ ﷺ يَوْمَ أُحُدٍ وَأَنَا ابْنُ أَرْبَعَ عَشْرَةَ سَنَةً فَلَمْ يُجِزْنِي، وَعُرِضْتُ عَلَيْهِ يَوْمَ الْخَنْدَقِ وَأَنَا ابْنُ خَمْسَ عَشْرَةَ سَنَةً فَأَجَازَنِي
قَالَ نَافِعٌ: فَقَدِمْتُ عَلَى عُمَرَ بْنِ عَبْدِ الْعَزِيزِ وَهُوَ خَلِيفَةٌ، فَحَدَّثْتُهُ هَذَا الْحَدِيثَ، فَقَالَ: إِنَّ هَذَا لَحَدُّ مَا بَيْنَ الصَّغِيرِ وَالْكَبِيرِ
হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) বলেন— ‘ওহুদ যুদ্ধের দিন আমাকে নবী (সা.)–এর সামনে উপস্থাপন করা হয়েছিল, তখন আমার বয়স ছিল চৌদ্দ বছর। কিন্তু তিনি আমাকে যুদ্ধে অংশগ্রহণের অনুমতি দেননি। পরে খন্দকের যুদ্ধের দিন আবার আমাকে উপস্থাপন করা হলে তখন আমার বয়স ছিল পনেরো বছর, তখন তিনি আমাকে অনুমতি দেন।’
হজরত নাফে (রহ.) বলেন, ‘আমি যখন খলিফা ওমর ইবনে আবদুল আজিজ (রহ.)–এর কাছে এ হাদিস বর্ণনা করলাম, তখন তিনি বললেন— ‘এটাই হচ্ছে ছোট ও বড় (অপ্রাপ্তবয়স্ক ও প্রাপ্তবয়স্ক)-এর মধ্যকার সীমারেখা।’ (বুখারি ২৬৬৪, মুসলিম ১৮৬৮)
এরপর তিনি (খলিফা ওমর ইবনে আবদুল আজিজ) তার গভর্নরদের নির্দেশ দেন, যাদের বয়স ১৫ বছর হয়েছে, তাদের যেন সেনাবাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত করা হয় এবং তাদের জন্য ভাতা নির্ধারণ করা হয়।
ইসলামে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া শুধু শারীরিক পরিবর্তনের বিষয় নয়; বরং এটি দায়িত্বশীল জীবনের সূচনা। বালেগ হওয়ার পর একজন মুসলমানের ওপর আল্লাহর বিধান পালন করা ফরজ হয়ে যায়। তাই পরিবার ও অভিভাবকদের উচিত সন্তানদের ছোটবেলা থেকেই ইসলামি শিক্ষা, নামাজ, পবিত্রতা ও নৈতিকতার প্রশিক্ষণ দেওয়া, যাতে তারা প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর সচেতন ও দ্বীনদার জীবন গড়ে তুলতে পারে। আল্লাহ তাআলা আমাদের সন্তানদের নেককার, দ্বীনদার ও উত্তম চরিত্রবান হিসেবে গড়ে ওঠার তৌফিক দান করুন। আমিন।







