সারাদেশ

বিদেশ থেকে আসে নির্দেশনা

চট্টগ্রামের আন্ডারওয়ার্ল্ড নিয়ন্ত্রণে বড় সাজ্জাদের দুই অনুসারী

নিউজ ডেস্ক

শেয়ারঃ

চট্টগ্রামের আন্ডারওয়ার্ল্ড নিয়ন্ত্রণে বড় সাজ্জাদের দুই অনুসারী

ছবি : সংগৃহীত

চট্টগ্রামে আলোচিত শীর্ষ সন্ত্রাসীরা এখনও অধরা। তারা কখনো প্রকাশ্যে, কখনো গোপনে নানা অপকর্ম করে বেড়াচ্ছে। প্রকাশ্যে খুন-খারাবিতে লিপ্ত রয়েছে। বিদেশে পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী খানের অনুসারী মোবারক হোসেন ইমন ওরফে ডেভিড ইমন, রায়হান এখন চট্টগ্রামের আন্ডারওয়ার্ল্ডের নেতৃত্ব দিচ্ছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন- আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি ও ঠেন্ডারবাজি ঘিরে সন্ত্রাসী গ্রুপগুলোর মধ্যেও খুনাখুনির মতো ঘটনা ঘটছে। সরকারি প্রতিষ্ঠানে টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ, ব্যবসায়ীদের কাছে চাঁদা দাবি, বালুমহাল নিয়ন্ত্রণ, অপহরণ বাণিজ্য ও কন্ট্রাক্ট কিলিংয়েও জড়িত তারা।


নগরী ও জেলায় এখন আতঙ্কের নাম সাজ্জাদের বাহিনী। সাজ্জাদ দেশে নয়, বিদেশে বসেই প্রযুক্তির সহায়তায় তার বাহিনী নিয়ন্ত্রণ করছে। সাজ্জাদ আলী খানের শিষ্য ছোট সাজ্জাদ, ডেভিড ইমন ও রায়হানের অপকর্ম বায়েজিদ ও পাঁচলাইশ এলাকায় সীমাবদ্ধ থাকলেও এখনও পুরো নগরীতে ছড়িয়ে পড়েছে। ছোট সাজ্জাদ ঢাকা থেকে গ্রেফতার হওয়ায় বর্তমানে বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ ডেভিড ইমন ও রায়হান আলমের হাতে। তাদের সন্ত্রাসী কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।


সর্বশেষ গত সোমবার নগরীর চন্দনপুরা এক্সেস রোডে একটি ইন্টারনেট সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানে প্রকাশ্যে হামলা ও লুটপাট চালায় ডেভিড ইমনের বাহিনী। ডেভিড ইমন স্বয়ং ফোন করে ওই প্রতিষ্ঠানের মালিকের কাছে ২ কোটি টাকা এককালীন চাঁদা এবং প্রতি মাসে ১০ লাখ টাকা করে দাবি করেছিল। দুদিন সময় বেঁধে দেওয়ার পর দাবিকৃত চাঁদা না পাওয়ায় তার লোকজন ওই প্রতিষ্ঠানে হামলা ও ৩৫ লাখ টাকা লুট করে। এই ঘটনায় থানায় মামলা হয়েছে। পুলিশ ৮ জনকে গ্রেফতার করলেও ইমনের খোঁজ পায়নি। তাকে গ্রেফতারে ফটিকছড়িতে সাঁড়াশি অভিযান ব্যর্থ হয়েছে।


সূত্র জানায়, বর্তমানে চট্টগ্রামের আন্ডারওয়ার্ল্ড নিয়ন্ত্রণ করছে মূলত দুজন। শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী খান ওরফে বড় সাজ্জাদের অনুসারী মোবারক হোসেন ইমন ওরফে ডেভিড ইমন ও মোহাম্মদ রায়হান। তাদের রয়েছে মাঝারি মানের ২০-৩০ জনের সন্ত্রাসী গ্রুপ। প্রত্যেকে আলাদা আলাদা গ্রুপ করে এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে। এদের বেশিরভাগই আবার কিশোর গ্যাং হিসেবে পরিচিত। এরমধ্যে খোরশেদ আলম, ভাতিজা মোহাম্মদ, নাজিম উদ্দিন, ববি আলম, কামাল, হাসান, নুরুল হক, বোরহান, মুবিন, কাদের, তপু, আজম, মনির, তুষার, তুহিন, সোহেল, ছালেক ও এরশাদের নাম পাওয়া গেছে।


আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্যমতে, ২০১৫ সাল থেকে বড় সাজ্জাদ বাহিনীর হাল ধরে সন্ত্রাসী সাজ্জাদ হোসেন ওরফে ছোট সাজ্জাদ। তার সঙ্গে ছিল মোবারক হোসেন ইমন ও মোহাম্মদ রায়হান। গত বছরের ১৫ মার্চ ঢাকার একটি শপিংমল থেকে ছোট সাজ্জাদকে গ্রেফতার করে পুলিশ। এরপর থেকে কারাগারেই আছে ছোট সাজ্জাদ। তার বিরুদ্ধে ১০টি হত্যাসহ মোট ১৯টি মামলা রয়েছে। ছোট সাজ্জাদ কারাগারে যাওয়ার পর বাহিনীর হাল ধরে রায়হান। তার বিরুদ্ধে খুনসহ বিভিন্ন অভিযোগে ২৪টি মামলা রয়েছে। বড় সাজ্জাদের অন্যতম সহযোগী মোবারক হোসেন ইমনের বিরুদ্ধে বাকলিয়ায় জোড়া খুনসহ অন্তত ১০টি মামলা রয়েছে।


দলের মাঝারি মানের সন্ত্রাসীরা মাঠ পর্যায়ে বড় ব্যবসায়ী বা শিল্পপতিদের তথ্য সংগ্রহ করে দেশের বাইরে থাকা শীর্ষ সন্ত্রাসী বা বড় সাজ্জাদের কাছে পাঠায়। এরপর বড় সাজ্জাদ নিজে ফোন করে অথবা ডেভিড ইমনকে দিয়ে ফোন করিয়ে হুমকি-ধমকি দিয়ে মোটা অংকের চাঁদা আদায় করে। হুমকি-ধমকিতে কাজ না হলেও এলাকাভিত্তিক সশস্ত্র সন্ত্রাসী বা কিশোর গ্যাং পাঠিয়ে ভাঙচুর বা হামলা করে। এমনকি গুলি করতেও দ্বিধা করে না তারা।


চট্টগ্রামের শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ হোসেন ওরফে ছোট সাজ্জাদকে পুলিশ গ্রেফতার করতে পারলেও অধরা তার সহযোগীরা। উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি তার বাহিনীর কাছে থাকা ভারী অস্ত্রও। সাজ্জাদ গ্রেফতার হলেও চট্টগ্রামের পাঁচলাইশ, বায়েজিদ, খুলশি ও চান্দগাঁও এলাকার মানুষের মাঝে আতঙ্ক কাটেনি। পাশাপাশি চট্টগ্রামের রাউজান ও রাঙ্গুনিয়া উপজেলার মানুষও এখনও আতঙ্কিত।


তাদের যত অপকর্ম

১৩ জুন এই সন্ত্রাসী বাহিনীর গুলিতে নির্মমভাবে খুন হন রাঙ্গুনিয়া উপজেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক মাসুদুল হক চৌধুরী। রাউজান উপজেলার পাহাড়তলী চৌমুহনী বাজারে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয় তাকে। এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় বড় সাজ্জাদের অন্যতম সহযোগী হিসেবে পরিচিত রায়হানসহ ১১ জনের নামে মামলা দায়ের করা হয়। ২০২৫ সালের ৩০ মার্চ চট্টগ্রামের বাকলিয়া এলাকার জোড়া খুন ও একই বছরের ২৩ মে রাতে পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকতে সন্ত্রাসী ঢাকাইয়া আকবর হত্যা মামলাসহ অন্তত সাতটি ফৌজদারি মামলার আসামি তিনি। ২০২৪ সালের ২৮ আগস্ট আনিস ও মোহাম্মদ হাসান নামে দুজনকে ব্রাশ ফায়ারে হত্যা করা হয়। এই হত্যাকাণ্ডে তাদের সম্পৃক্ততা রয়েছে বলে মনে করা হয়। রায়হানের বিরুদ্ধেও চাঁদাবাজি, অবৈধ অস্ত্র রাখা, হত্যা ও অন্যান্য অপরাধের অভিযোগে অন্তত আটটি মামলা রয়েছে।


দুই দফায় চকবাজার থানার চন্দনপুরা এলাকায় স্মার্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমানের বাসা লক্ষ্য করে ভারী অস্ত্র দিয়ে গুলি চালায় সন্ত্রাসীরা। প্রথম দফায় ২ জানুয়ারি বাসাটি লক্ষ্য করে গুলি বর্ষণ করা হয়। এরপর ২৮ ফেব্রুয়ারি ভারি অস্ত্র দিয়ে মুহুর্মুহু গুলি করা হয়। ১০ কোটি টাকা চাঁদার দাবিতে পুলিশের পাঁচ সদস্য পাহারারত অবস্থায় ওই ভবন লক্ষ্য করে গুলি চালানোর ঘটনা বেশ চাঞ্চল্য সৃষ্টি করে। গুলিতে বাসার জানালার কাঁচ ভেঙে যায়। সাজ্জাদ আলী ওরফে বড় সাজ্জাদের অনুসারীরা এ ঘটনায় জড়িত বলে পুলিশ জানিয়েছে।

সিএমপির সিনিয়র সহকারী পুলিশ কমিশনার (জনসংযোগ) আমিনুর রশীদ যুগান্তরকে জানান, সন্ত্রাসীদের গ্রেফতারে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। ইতোমধ্যে বেশ কয়েকজন সন্ত্রাসীকে গ্রেফতার করে আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে। পলাতক আসামীদের গ্রেফতার করতে বহুমাত্রিক অভিযান চলছে।



সম্পর্কিত খবর