আন্তর্জাতিক
৩০০ ফুট নিচে নেমেছিল এয়ার ইন্ডিয়ার ফ্লাইট, পাইলটের শরীরে মিলল গাঁজার উপস্থিতি

ছবি : সংগৃহীত
চলতি মাসের শুরুতে ক্রুজিং উচ্চতা থেকে হঠাৎ প্রায় ৩০০ ফুট নিচে নেমে যাওয়া এয়ার ইন্ডিয়ার একটি ফ্লাইটের ক্যাপ্টেনের শরীরে গাঁজার উপস্থিতি নিশ্চিত হয়েছে। ঘটনার পর বিষয়টি নিয়ে তদন্ত শুরু করেছে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ। একই সঙ্গে উড়োজাহাজটির কারিগরি ত্রুটি, পাইলটের আচরণ এবং পুরো ঘটনার সময়কার পরিস্থিতিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য ইন্ডিপেনডেন্টের প্রতিবেদনের বরাতে জানা যায়, গত ৪ আগস্ট ফুকেট থেকে দিল্লিগামী এয়ার ইন্ডিয়ার একটি ফ্লাইট ক্রুজিং উচ্চতায় থাকা অবস্থায় হঠাৎ প্রায় ৩০০ ফুট নিচে নেমে যায়। এতে বেশ কয়েকজন যাত্রী ও ক্রু আহত হন। পরে বিমানটি নিরাপদে দিল্লিতে অবতরণ করে।
ঘটনার পর উড়োজাহাজটির দুই পাইলটের মাদক পরীক্ষা করা হয়। ভারতের বেসামরিক বিমান চলাচল মন্ত্রণালয় জানায়, ক্যাপ্টেনের প্রথম পরীক্ষায় গাঁজা ব্যবহারের সম্ভাবনা পাওয়া যায়। বিষয়টি নিশ্চিত করতে তার নমুনার দ্বিতীয় পরীক্ষা করা হয়। পরে তদন্তসংশ্লিষ্ট একটি সূত্র রয়টার্সকে জানায়, দ্বিতীয় পরীক্ষাতেও ক্যাপ্টেনের শরীরে গাঁজার উপস্থিতি নিশ্চিত হয়েছে।
তদন্তকারীরা এখন ঘটনার সময় ক্যাপ্টেনের আচরণও খতিয়ে দেখছেন। কেবিন ক্রুরা এয়ার ইন্ডিয়ার কাছে অভিযোগ করেছিলেন, ফ্লাইট চলাকালে ক্যাপ্টেনকে পুরোপুরি স্বাভাবিক মনে হয়নি।
একটি বাণিজ্যিক ফ্লাইটের চূড়ান্ত কর্তৃত্ব ও আইনি দায়িত্ব ক্যাপ্টেনের ওপরই থাকে। ফলে ঘটনার সময় তার অবস্থান ও ভূমিকা তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।
ঘটনার সময় ককপিটে কী ঘটেছিল?
এনডিটিভির হাতে আসা এয়ার ইন্ডিয়ার অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট সেফটি প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ঘটনার সময় ক্যাপ্টেন নিজের আসনে ছিলেন না। তিনি কো-পাইলটের আসনের পেছনে দাঁড়িয়ে বিমানের এয়ার কন্ডিশনিং ব্যবস্থা নিয়ে কথা বলছিলেন।
এ সময় হঠাৎ একটি সতর্কসংকেত বেজে ওঠে। একই সঙ্গে অটোপাইলট বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং বিমানের সামনের অংশ ওপরে উঠে যায়।
তখন উড়োজাহাজটি চালাচ্ছিলেন কো-পাইলট। স্টল সতর্কসংকেত পাওয়ার পর তিনি বিমানের সামনের অংশ নিচের দিকে নামিয়ে দেন। এর পরপরই বিমানটি দ্রুত নিচে নামতে শুরু করে।
বিমানের আকস্মিক গতিবিধির কারণে ককপিটের কিছু আলগা জিনিস ওপরে উঠে যায়। ক্যাপ্টেন ও কো-পাইলটও নিজেদের আসন থেকে ওপরে উঠে যান।
ক্যাপ্টেনের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি ককপিটের বিভিন্ন জিনিসপত্র এবং কো-পাইলটকে ওপরে ভেসে যেতে দেখছিলেন। তিনিও তখন ভাসছিলেন। পরে তির্যকভাবে নিজের আসনের দিকে ফিরে গিয়ে সিটবেল্টের সংকেত চালু করেন।
আসনে বসে সিটবেল্ট বাঁধার পর তিনি বলেন, ‘আমি নিয়ন্ত্রণ নিচ্ছি।’ এরপর বিমানটি নিচে নামতে থাকা অবস্থায় তিনি নিয়ন্ত্রণ নেন।
বিমানের গতি ও উচ্চতা কমে যাওয়া ঠেকাতে ক্যাপ্টেন থ্রটল সর্বোচ্চ নিরবচ্ছিন্ন শক্তিতে নিয়ে যান। তবে ততক্ষণে বিমানটি প্রায় ৩০০ ফুট নিচে নেমে গেছে।
যান্ত্রিক ত্রুটির সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে
শুধু পাইলটের ভূমিকা নয়, ঘটনার পেছনে বিমানের কোনো কারিগরি ত্রুটি ছিল কি না, সেটিও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। ইন্ডিপেনডেন্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তদন্তকারীরা উড়োজাহাজটির বিভিন্ন ব্যবস্থায় সম্ভাব্য ত্রুটির বিষয়টি খতিয়ে দেখছেন।
প্রকৌশলসংক্রান্ত নথিতে দেখা গেছে, বিমানের হাইড্রোলিক ব্যবস্থায় কম চাপের সংকেত পাওয়া গিয়েছিল। হাইড্রোলিক ব্যবস্থায় চাপযুক্ত তরল ব্যবহার করে বিমানের নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, ল্যান্ডিং গিয়ার, ব্রেকসহ বিভিন্ন ভারী যান্ত্রিক অংশ পরিচালনা করা হয়।
এ ছাড়া অটোপাইলট বিচ্ছিন্ন হওয়ার পাশাপাশি এলিভেটর ত্রুটির সংকেতও পাওয়া যায়। এর ফলে ধারণা করা হচ্ছে, বিমানের পিচ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় কোনো সমস্যা হয়ে থাকতে পারে।
পিচ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে পাইলট বিমানের সামনের অংশ ওপরে বা নিচে তুলতে পারেন। এর ওপর নির্ভর করে বিমান ওপরে ওঠে, নিচে নামে অথবা একই উচ্চতায় উড়তে থাকে।
ঘটনার পর এয়ার ইন্ডিয়া জানিয়েছিল, ক্রুজিংয়ের সময় বিমানটি অল্প সময়ের জন্য টার্বুলেন্সের মধ্যে পড়েছিল। এতে বিমানের উচ্চতায় সাময়িক পরিবর্তন ঘটে।
তদন্তে প্রযুক্তিগত ও মানবিক—সব দিকই গুরুত্ব পাচ্ছে
ঘটনার প্রকৃত কারণ এখনো চূড়ান্তভাবে নির্ধারণ করা হয়নি। ভারতের বেসামরিক বিমান চলাচল মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এয়ারক্রাফট অ্যাক্সিডেন্ট ইনভেস্টিগেশন ব্যুরো (এএআইবি) ঘটনাটির সঙ্গে সম্পর্কিত প্রযুক্তিগত, পরিচালনাগত, চিকিৎসা ও মানবিক—সব ধরনের তথ্য সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও পরীক্ষা করছে।
তদন্তের অংশ হিসেবে বিমানের বিভিন্ন অংশ ও ব্যবস্থা, রেকর্ড করা ফ্লাইট তথ্য, পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণসংক্রান্ত নথি, চিকিৎসাসংক্রান্ত তথ্য এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সাক্ষাৎকার পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
মন্ত্রণালয় স্পষ্ট করে জানিয়েছে, কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে সব ধরনের প্রমাণ সামগ্রিকভাবে পরীক্ষা করা হবে।
এদিকে, বিষয়টি নিয়ে এয়ার ইন্ডিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য পায়নি।
এয়ার ইন্ডিয়ার জন্য আরেকটি নিরাপত্তা-সংক্রান্ত ধাক্কা
ঘটনাটি এমন এক সময়ে সামনে এলো, যখন এয়ার ইন্ডিয়া ইতোমধ্যে একাধিক নিরাপত্তা তদন্তের মুখে রয়েছে। গত ৪ আগস্টের ঘটনার পর উড়োজাহাজটির ফ্লাইট ডেটা রেকর্ডার ও ককপিট ভয়েস রেকর্ডারও তদন্তের জন্য জব্দ করা হয়েছে। তদন্তে সহায়তা করতে এয়ারবাস বিশেষজ্ঞ পাঠানোর কথাও জানিয়েছে।
এরই মধ্যে ক্যাপ্টেনের নিশ্চিত মাদক পরীক্ষার ফল প্রকাশ্যে আসার পর এয়ার ইন্ডিয়া সব পাইলটের মাদক পরীক্ষা আরও বিস্তৃত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, নতুন ব্যবস্থায় নিয়মিত প্রশিক্ষণ, ফ্লাইটের পর এবং বিভিন্ন নির্ধারিত স্থানে পাইলটদের পরীক্ষা করা হবে। এয়ার ইন্ডিয়া এক্সপ্রেসের পাইলটরাও এই পরীক্ষার আওতায় থাকবেন।
ইন্ডিপেনডেন্টের প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৫ সালে এয়ার ইন্ডিয়ার একটি বোয়িং ৭৮৭ ড্রিমলাইনার দুর্ঘটনায় ২৬০ জন নিহত হওয়ার পর থেকেই সংস্থাটি বাড়তি নজরদারির মধ্যে রয়েছে। ওই দুর্ঘটনার পর বিভিন্ন ত্রুটি নিয়ে তদন্ত শুরু হয়। পাশাপাশি ভারতের পুরো বিমান চলাচল খাতের নিরাপত্তা নিয়েও নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
সব মিলিয়ে, ফুকেট-দিল্লি ফ্লাইটের আকস্মিক উচ্চতা হারানোর ঘটনা এখন একাধিক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। পাইলটের শরীরে গাঁজার উপস্থিতি নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি বিমানের হাইড্রোলিক ব্যবস্থা, এলিভেটর, অটোপাইলট ও পিচ নিয়ন্ত্রণে সম্ভাব্য ত্রুটির বিষয়ও সামনে এসেছে। ফলে তদন্তের চূড়ান্ত প্রতিবেদনে মানবিক কারণ ও কারিগরি ত্রুটির মধ্যে কোনটি কতটা ভূমিকা রেখেছিল, সেটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
তথ্যসূত্র: রয়টার্স, দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট ও এনডিটিভি







