জাতীয়

গ্যাস সংকটে হিমশিম চালকরা

‘এক হাজার টাকা ভাড়া মারছি, জমা ১২শ’

নিউজ ডেস্ক

শেয়ারঃ

‘এক হাজার টাকা ভাড়া মারছি, জমা ১২শ’

ছবি : সংগৃহীত

গ্যাস সংকটের কারণে ভোগান্তি যেন কমছেই না। প্রতিদিন বড় একটি সময় ফিলিং স্টেশনে গ্যাসের জন্য অপেক্ষা করতেই কেটে যাচ্ছে। কখনো আবার গ্যাস না পেয়ে খালি গাড়ি নিয়ে ফিরতে হচ্ছে। এতে একদিকে যেমন যাত্রী পরিবহণ কমে যাচ্ছে, অন্যদিকে জ্বালানি সংগ্রহেই নষ্ট হচ্ছে কর্মঘণ্টা। ফলে নির্ধারিত জমার টাকা তুলতে পারছেন না অনেক সিএনজি চালক। আয় কমে গিয়ে সংসার চালাতেও হিমশিম খাচ্ছেন তারা। মঙ্গলবার সকাল থেকে রাজধানীর বিভিন্ন সিএনজি ফিলিং স্টেশন ঘুরে এবং চালক ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে এমন চিত্র পাওয়া গেছে।


মিরপুর ১২ নম্বর ইনট্রাকো ফিলিং স্টেশনে গ্যাসের জন্য অপেক্ষমাণ প্রাইভেটকার চালক মুন্না বলেন, ১৬০ টাকার গ্যাস ভরেছি। এই গ্যাস দিয়ে কী হবে। বড় জোর ২ ট্রিপ মারা যাবে। গত কয়েক দিন ২-৩ বার পাম্পে আসতে হয়েছে। আজও আসা লাগবে।

সিএনজি চালক রাজু মিয়া বলেন, আধা ঘণ্টার মতো অপেক্ষা করে ৪০-৫০ টাকার গ্যাস পেয়েছি। এভাবে চলতে থাকলে মালিকের জমা ও সংসারের খরচ চালানো অসম্ভব হয়ে পড়বে।

ইনট্রাকো ফিলিং স্টেশনে অপেক্ষমাণ সিএনজিচালক আলমগীর বলেন, ‘গতকাল শুধু ৬০ টাকার গ্যাস পাইছি। ওই গ্যাস দিয়া এক হাজার টাকা ভাড়া মারছি, জমা ১২০০ টাকা। মালিকই খাবে কী, আর আমিই খামু কী।’

মঙ্গলবার সকাল থেকে উত্তরার আব্দুল্লাহপুর, বিমানবন্দর, খিলক্ষেতসহ বিভিন্ন সিএনজি ফিলিং স্টেশন ঘুরে দেখা যায়, গ্যাস না থাকায় অধিকাংশ ফিলিং স্টেশন বন্ধ রয়েছে। কোথাও কোথাও পাম্প চালু থাকলেও পর্যাপ্ত গ্যাসের চাপ না থাকায় স্বাভাবিকভাবে গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে সিএনজি, ট্রাক ও অন্যান্য গ্যাসচালিত যানবাহনে জ্বালানি সরবরাহ কার্যত বন্ধ রয়েছে। আব্দুল্লাহপুরের পূর্ব পাশে খন্দকার ফিলিং স্টেশন এবং বিমানবন্দর-খিলক্ষেত এলাকার বিভিন্ন পাম্পে গিয়ে দেখা যায়, দীর্ঘ সারিতে অপেক্ষা করেও চালকরা গ্যাস পাচ্ছেন না। তবে ডিজেল ও অকটেনচালিত যানবাহনে জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে। খন্দকার ফিলিং স্টেশনের অপারেটর মনির যুগান্তরকে বলেন, আমাদের কাছেই যদি গ্যাস না থাকে, তাহলে গ্রাহকদের কীভাবে গ্যাস দেব? গত দুই সাপ্তাহ ধরে পর্যাপ্ত গ্যাস পাচ্ছি না। গ্যাস না পেয়ে ফিরে যাচ্ছেন সিএনজি চালকরা। আমাদের পাম্প একেবারে বন্ধ রয়েছে।


ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের আব্দুল্লাহপুর এলাকার পশ্চিম পাশে অবস্থিত আরএসআর ফিলিং স্টেশনেও একই চিত্র দেখা গেছে। সেখানে বিক্রয়কর্মী জানে আলম বলেন, পাঁচ-ছয় দিন ধরে এই সমস্যা চলছে। দুপুর ১টার দিকে কিছুক্ষণ গ্যাসের চাপ ছিল, পরে আবার চলে গেছে। এ বিষয়ে তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন ও ডিস্ট্রিবিউশন জোন-৯-এর ম্যানেজার প্রকৌশলী মো. আনোয়ারুল আজিম যুগান্তরকে জানান, চাহিদার তুলনায় গ্যাসের সরবরাহ কম থাকায় সংকট দেখা দিয়েছে। ডেমরার রাসেল ফিলিং ও সিএনজি স্টেশনে এবং হাজী সিএনজি ফিলিং স্টেশনে মঙ্গলবারও দিনভর সিএনজিচালিত যানবাহনের দীর্ঘ সারি দেখা গেছে। গ্যাস না থাকার কারণে আগের মতোই দেখা গেছে চারটি হোসের মধ্যে ১টি সচল রাখতে পারছে রাসেল ফিলিং স্টেশন। একই সঙ্গে মীরপাড়া এলাকায় অবস্থিত হাজী ফিলিং স্টেশনেও গ্যাস পেতে যানবাহন চালকরা দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করে অনেকে ফিরে যাচ্ছেন। সেখানেও প্রেশার ফল করায় ১ হোস পাইপ লাইন দিয়ে গ্যাস ফিলিং করতে হয়েছে। যাত্রাবাড়ী থেকে ডেমরায় গ্যাস নিতে আসা সিএনজিচালক মো. সারোয়ার আরিফ যুগান্তরকে জানান, আমরা কি পরিবারসহ না খেয়ে মরব?

রাজধানীর মহাখালীর আরজতপাড়া, বাসস্ট্যান্ড, নাবিস্কো, তেজগাঁও এলাকার কাওরান বাজার, সাতরাস্তার মোড় ও শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ সরণিতে দুপুরের পর সিএনজি স্টেশনগুলোতে ঘুরে দেখা যায়, আরজতপাড়ার ইউরেকা, বাসট্যান্ড এলাকায় এবিএন, রয়েল, ইসা গার্ডেন, ক্লিন ক্লেয়ার, নাবিস্কোর সাউদার্ন, তাজউদ্দীন আহমদ সরণিতে সিটি, অল-ইন-ওয়ান এবং কাওরান বাজারের কানাডা-বাংলা সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতে গ্যাসের চাপ কম থাকায় লম্বা লাইন সিএনজি অটোরিকশা ও প্রাইভেটকারের। এখনো বন্ধ রয়েছে রাজধানীর সবচেয়ে সচল এবং সুপরিচিত সাতরাস্তা মোড়ের আকিজ সিনজি স্টেশন। প্রবেশপথে সাইনবোর্ডে লিখা রয়েছে গ্যাস নেই। দায়িত্বে নিয়োজিত গার্ড ও নজেলম্যানদের সাথে কথা বলে জানা যায় ৪/৫ দিন গ্যাসের অভাবে বন্ধ রয়েছে এ সিএনজি ফিলিং স্টেশনটি।


ইউরেকা সিএনজি ফিলিং স্টেশনের প্রাইভকারের লম্বা লাইনের শেষ প্রান্তে মহাখালী বাসস্ট্যান্ডের কাছাকাছি সিরিয়ালে দাড়িয়েছে প্রাইভেটকার নিয়ে আবুল কালাম, কথা হয় তার সাথে। তিনি হতাশার সুরে জানালেন কয় ঘন্টা লাগবে তা বলা যাচ্ছেনা। আরজতপাড়া ইউরেকা সিএনজি ফিলিং স্টেশন থেকে ৩ ঘন্টা লাইনে দাঁড়িয়ে সবে মাত্র ৫০ টাকার গ্যাস পেলেন মিরপুর থেকে আসা সিএনজি চালিত অটোরিকশা চালক রানা। তিনি যুগান্তরকে বলেন, এ রোদের মধ্যে লাইনে দাঁড়িয়ে এতক্ষণ পরে মাত্র ৫০ টাকার গ্যাস পেলাম।এ অবস্থায় কেমনে কি করব মাথা কাজ করছেনা।

মহাখালী বাসস্ট্যান্ড এলাকার এবিএন সিএনজি ফিলিং স্টেশন এর ম্যানেজার শহীদুল জানান গ্যাসের চাপ এত কম যে কোনরকম কিছুক্ষণ সরবরাহ করার পর অটো বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। আবার কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পর আবার চালু হচ্ছে এভাবেই চলছে। মঙ্গলবার সকালে রাজধানীর মালিবাগ, মুগদা বিশ্বরোড, মতিঝিল, মানিকনগর, খিলগাঁও, সবুজবাগ, বনশ্রী, গোড়ানসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে গ্যাস সংকটের এমন চিত্র দেখা গেছে। গ্যাস না থাকায় অনেক স্টেশন বন্ধ রয়েছে। যেসব স্টেশন চালু রয়েছে, সেখানেও গ্যাসের চাপ কম থাকায় ধীরগতিতে সরবরাহ করা হচ্ছে। ফলে সকাল থেকে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায় সিএনজি ও ব্যক্তিগত গাড়িকে।

মালিবাগ হাজীপাড়া সিএনজি ফুয়েলিং স্টেশন, বিশ্বরোডের শান্ত সিএনজি রি-ফুয়েলিং স্টেশন, আরকে মিশন রোডের এন.এস. সিএনজি ফিলিং অ্যান্ড সার্ভিসিং সেন্টার এবং মানিকনগরের বেস্ট ইস্টার্ন সিএনজি ফিলিং স্টেশনসহ বিভিন্ন স্টেশনে দীর্ঘ যানবাহনের সারি দেখা যায়। কোথাও কোথাও গ্যাসের স্বল্পচাপের কারণে সীমিত পরিসরে সরবরাহ করা হচ্ছে। আবার কোনো কোনো স্টেশনে সাময়িকভাবে সরবরাহ বন্ধ রাখা হচ্ছে।



সম্পর্কিত খবর