জাতীয়

নির্বাচনি উত্তাপে শৃঙ্খলার প্রতীক সেনাবাহিনী

সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

শেয়ারঃ

নির্বাচনি উত্তাপে শৃঙ্খলার প্রতীক সেনাবাহিনী

ফাইল ছবি

বাংলাদেশে নির্বাচন মানে শুধুই ভোটের দিন নয়; এটি রাজনৈতিক উত্তাপ, জনমতের প্রকাশ এবং একপ্রকার সামাজিক পরীক্ষা। প্রতিবার ভোটের আগে অস্থিরতা, বিতর্ক এবং কখনো কখনো সহিংসতা দেখা দেয়। ভোটাররা কি নির্ভয়ে ভোট কেন্দ্রে পৌঁছতে পারবেন? ভোটে বাধা বা অবৈধ কর্মকাণ্ড কি নির্বাচনি পরিবেশকে ব্যাহত করবে? এই প্রশ্নগুলো নির্বাচনের উত্তাপে জনমনে উদ্বেগ তৈরি করে।


এই অস্থির পরিস্থিতিতে সেনাবাহিনীর উপস্থিতি এক ধরনের শৃঙ্খলা, নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার প্রতীক হিসেবে কাজ করে। বাংলাদেশে সেনাবাহিনী দীর্ঘদিন ধরে নির্বাচনী নিরাপত্তায় দায়িত্ব পালন করছে। সাম্প্রতিক ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট ২০২৬ এর প্রস্তুতির অংশ হিসেবে সেনাবাহিনী মাঠপর্যায়ে মোতায়েন হয়েছে। এটি ভোটারদের মধ্যে নিরাপত্তাবোধ জাগায় এবং নির্বাচনের স্বচ্ছতা ও সুষ্ঠুতাকে নিশ্চিত করতে সহায়তা করে।

নির্বাচনী উত্তাপে সেনাবাহিনীর উপস্থিতির সবচেয়ে বড় প্রভাব হলো ভোটারদের নিরাপত্তাবোধ। অনেক ভোটার মনে করেন—যেখানে সাধারণ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিরাপত্তা দিতে অক্ষম, সেখানে সেনাবাহিনী তাদের সুরক্ষা দেবে। এটি ভোটারদের নির্ভয়ে ভোটাধিকার প্রয়োগে উৎসাহিত করে। এছাড়া সেনাবাহিনী মোতায়েন সহিংসতা ও অপরাধের সম্ভাবনাকে কমিয়ে আনে। সাম্প্রতিক সময়ে তারা অবৈধ অস্ত্র, গোলাবারুদ উদ্ধার এবং সন্দেহভাজনদের আটক করার মাধ্যমে নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতা নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

নির্বাচনে সেনাবাহিনীর ভূমিকা শুধু নিরাপত্তা প্রদানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। তারা নির্বাচন কমিশন ও স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে, যাতে ভোট কেন্দ্রের শৃঙ্খলা বজায় থাকে। তাদের পেশাদারিত্ব ভোটের দিন উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণে সহায়ক। এই প্রক্রিয়ায় ভোটাররা বুঝতে পারেন, নির্বাচন শুধু রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা নয়, বরং একটি সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ গণতান্ত্রিক উৎসব।

তবে সেনাবাহিনীর উপস্থিতি সবসময়ই বিতর্কের বিষয়। অনেক সমালোচক মনে করেন—কেন্দ্রের খুব কাছে সেনা মোতায়েন ভোটারদের ওপর মানসিক চাপ তৈরি করতে পারে। নির্বাচনের প্রক্রিয়ার স্বতন্ত্রতা প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে। এছাড়া কিছু জায়গায় সেনাবাহিনীর বিচারিক ক্ষমতা নিয়ে আইনি সীমারেখার প্রশ্নও উঠে। যদিও বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের নিয়ম অনুযায়ী সেনাবাহিনীকে নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করতে বলা হয়েছে, বাস্তবে এটি সব সময় সহজ নয়।

তবুও বর্তমান রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে সেনাবাহিনীর ভূমিকা একটি স্থিতিশীল, নিরপেক্ষ এবং নিরাপদ ভোটপরিবেশ নিশ্চিত করা। এটি ভোটারদের আস্থা বৃদ্ধি করে, সহিংসতা প্রতিরোধে কার্যকর এবং সুষ্ঠু ভোটের মান বজায় রাখে। সেনাবাহিনীর উপস্থিতি মানে ভোটারদের জন্য একটি নিরাপত্তার বার্তা, যা ভোটের সুষ্ঠু প্রয়োগে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

সংক্ষেপে বলা যায়, বাংলাদেশের নির্বাচনকে উৎসবমুখর, সুষ্ঠু ও স্বচ্ছ রাখতে সেনাবাহিনী একটি শৃঙ্খলার প্রতীক। তারা শুধু অস্ত্রধারী বাহিনী নয়; তারা দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার এক অংশ, যারা নিরাপত্তা, স্থিতিশীলতা এবং জনমতের যথাযথ প্রকাশ নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। গণতন্ত্রের সুষ্ঠু কার্যক্রম নিশ্চিত করতে সেনাবাহিনীর এ অবদানকে অস্বীকার করা যায় না।

নির্বাচনী উত্তাপে সেনাবাহিনীর উপস্থিতি তাই শুধু নিরাপত্তার মাধ্যম নয়, এটি গণতন্ত্রের আস্থা, স্থিতিশীলতা এবং শৃঙ্খলার প্রতীক, যা ভোটারদের শক্তিশালী, নির্ভরযোগ্য এবং শান্তিপূর্ণ ভোট প্রদানের পরিবেশ নিশ্চিত করে।


সম্পর্কিত খবর