ধর্ম

মুসলিম নারী-পুরুষের সার্বক্ষণিক ফরজ দায়িত্ব কী?

নিউজ ডেস্ক

শেয়ারঃ

মুসলিম নারী-পুরুষের সার্বক্ষণিক ফরজ দায়িত্ব কী?

ছবি : সংগৃহীত

ইসলাম এমন একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা, যেখানে ইবাদত শুধু মসজিদ বা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং একজন মুমিনের প্রতিটি মুহূর্ত আল্লাহর আনুগত্যে অতিবাহিত হওয়াই প্রকৃত ইবাদত। তাই কিছু দায়িত্ব রয়েছে, যা একজন মুসলিম নারী ও পুরুষকে সারাজীবন সচেতনভাবে পালন করতে হয়। ইসলামী পরিভাষায় এগুলোর মধ্যে কিছু ফরজ, কিছু ওয়াজিব এবং কিছু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শরয়ি নির্দেশনা। এসব বিধান যথাযথভাবে পালন করলে ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজে আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং কল্যাণ প্রতিষ্ঠিত হয়।


মহান আল্লাহ বলেন—

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا ادْخُلُوا فِي السِّلْمِ كَافَّةً

‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা ইসলামে পরিপূর্ণভাবে প্রবেশ কর।’ (সুরা আল-বাকারা: আয়াত ২০৮)


নারী-পুরুষ উভয়ের জন্য সার্বক্ষণিক ফরজ ও অপরিহার্য দায়িত্বগুলো হলো—


১. ইমান অটুট রাখা

জীবনের সবচেয়ে বড় ফরজ হলো বিশুদ্ধ আকিদার উপর প্রতিষ্ঠিত থাকা এবং মৃত্যু পর্যন্ত ইমান সংরক্ষণ করা। আল্লাহ তাআলা বলেন—

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ حَقَّ تُقَاتِهِ وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنْتُمْ مُسْلِمُونَ

‘হে ঈমানদারগণ! আল্লাহকে যথাযথভাবে ভয় কর এবং মুসলিম না হয়ে কখনো মৃত্যুবরণ কর না।’ (সুরা আল-ইমরান: আয়াত ১০২)


২. তাকওয়া অবলম্বন করা

সকল অবস্থায় আল্লাহর ভয় ও সচেতনতা নিয়ে জীবন পরিচালনা করা প্রতিটি মুমিনের কর্তব্য। আল্লাহ তাআলা বলেন—

إِنَّ أَكْرَمَكُمْ عِنْدَ اللَّهِ أَتْقَاكُمْ

‘নিশ্চয় আল্লাহর কাছে তোমাদের মধ্যে সর্বাধিক সম্মানিত সেই ব্যক্তি, যে সর্বাধিক তাকওয়াবান।’ (সুরা আল-হুজুরাত: আয়াত ১৩)


৩. শিরক, কুফর ও সকল পাপ থেকে বেঁচে থাকা

আল্লাহর অবাধ্যতা থেকে বিরত থাকা ইমানের দাবি। আল্লাহ তাআলা বলেন—

إِنَّ اللَّهَ لَا يَغْفِرُ أَنْ يُشْرَكَ بِهِ

‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তার সঙ্গে শরিক করাকে ক্ষমা করেন না।’ (সুরা আন-নিসা: আয়াত ৪৮)


৪. লজ্জাস্থান ও দৃষ্টির হেফাজত করা

পুরুষ ও নারী উভয়ের জন্যই দৃষ্টি সংযত রাখা এবং পবিত্রতা রক্ষা করা আল্লাহর নির্দেশ। আল্লাহ তাআলা বলেন—

قُلْ لِلْمُؤْمِنِينَ يَغُضُّوا مِنْ أَبْصَارِهِمْ... وَقُلْ لِلْمُؤْمِنَاتِ يَغْضُضْنَ مِنْ أَبْصَارِهِنَّ

‘মুমিন পুরুষদের বলুন তারা যেন তাদের দৃষ্টি সংযত রাখে... আর মুমিন নারীদেরও বলুন তারা যেন তাদের দৃষ্টি সংযত রাখে।’ (সুরা আন-নুর: আয়াত ৩০–৩১)


৫. ফরজ ইবাদত যথাসময়ে আদায় করা

পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ, রমজানের রোজা, যাদের ওপর ফরজ তাদের জন্য জাকাত ও হজ—এসব ইসলামের মৌলিক ফরজ ইবাদত। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—

بُنِيَ الْإِسْلَامُ عَلَى خَمْسٍ

‘ইসলাম পাঁচটি স্তম্ভের উপর প্রতিষ্ঠিত।’ (বুখারি ৮, মুসলিম ১৬)


৬. পবিত্রতা অর্জন

যখন গোসল ফরজ হয়, তখন গোসল করা এবং নামাজের জন্য পবিত্রতা অর্জন করা ফরজ।

وَإِنْ كُنْتُمْ جُنُبًا فَاطَّهَّرُوا

‘আর যদি তোমরা অপবিত্র (জুনুব) হও, তবে পূর্ণরূপে পবিত্রতা অর্জন কর।’ (সুরা আল-মায়িদাহ: আয়াত ৬)


৭. হালাল-হারাম মেনে চলা

উপার্জন, খাদ্য, পোশাক, লেনদেন ও জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আল্লাহর বিধান মেনে চলা অপরিহার্য।

يَا أَيُّهَا النَّاسُ كُلُوا مِمَّا فِي الْأَرْضِ حَلَالًا طَيِّبًا

‘হে মানুষ! পৃথিবীতে যা কিছু হালাল ও পবিত্র রয়েছে তা থেকে আহার কর।’ (সুরা আল-বাকারা: আয়াত ১৬৮)



৮. ইলম অর্জন করা

প্রতিটি মুসলিমের জন্য অন্তত নিজের ফরজ ইবাদত ও দৈনন্দিন জীবন সঠিকভাবে পরিচালনার প্রয়োজনীয় শরঈ জ্ঞান অর্জন করা অপরিহার্য। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—

طَلَبُ الْعِلْمِ فَرِيضَةٌ عَلَى كُلِّ مُسْلِمٍ

‘প্রয়োজনীয় দ্বীনি জ্ঞান অর্জন করা প্রত্যেক মুসলিমের জন্য কর্তব্য।’ (ইবন মাজাহ ২২৪)


৯. পরিবার ও আমানতের হক আদায়

পুরুষ ও নারী উভয়েই নিজ নিজ দায়িত্ব সম্পর্কে জবাবদিহি করবেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—

كُلُّكُمْ رَاعٍ وَكُلُّكُمْ مَسْئُولٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ

‘তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেককেই তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।’ (বুখারি ৮৯৩, মুসলিম ১৮২৯)


১০. উত্তম চরিত্র ও মানুষের হক আদায়

সত্যবাদিতা, আমানতদারি, সুন্দর ব্যবহার এবং গিবত, মিথ্যা, গালাগালি ও অশ্লীলতা থেকে বিরত থাকা একজন মুমিনের বৈশিষ্ট্য। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—

مَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ فَلْيَقُلْ خَيْرًا أَوْ لِيَصْمُتْ

‘যে ব্যক্তি আল্লাহ ও আখিরাতে বিশ্বাস করে, সে যেন ভালো কথা বলে অথবা নীরব থাকে।’ (বুখারি ৬০১৮, মুসলিম ৪৭)


১১. তওবা অব্যাহত রাখা

মানুষ ভুল করতেই পারে। কিন্তু ভুলের পর বিলম্ব না করে আল্লাহর কাছে ফিরে আসাই মুমিনের পরিচয়। আল্লাহ তাআলা বলেন—

وَتُوبُوا إِلَى اللَّهِ جَمِيعًا أَيُّهَا الْمُؤْمِنُونَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ

‘হে মুমিনগণ! তোমরা সবাই আল্লাহর কাছে তওবা কর, যাতে তোমরা সফল হতে পার।’ (সুরা আন-নুর: আয়াত ৩১)


নারী ও পুরুষের কিছু বিশেষ দায়িত্ব

আল্লাহ তাআলা নারী ও পুরুষকে মর্যাদার দিক থেকে সমান সম্মান দিয়েছেন, তবে তাদের কিছু পারিবারিক ও সামাজিক দায়িত্ব ভিন্ন রেখেছেন। যেমন—

  1. পুরুষের ওপর পরিবারে ভরণ-পোষণের দায়িত্ব অর্পিত হয়েছে। (সুরা আন-নিসা: আয়াত ৩৪)
  2. নারীর জন্য শালীনতা ও পর্দা রক্ষা এবং পরিবারের আমানত সংরক্ষণের বিশেষ গুরুত্ব এসেছে। (সুরা আন-নুর: আয়াত ৩১)
  3. স্বামী-স্ত্রী উভয়ের ওপর একে অপরের হক আদায়, সদাচরণ এবং আল্লাহর আনুগত্যে সহযোগিতা করা অপরিহার্য।

মুসলিম জীবনের প্রকৃত সফলতা কেবল কিছু নির্দিষ্ট ইবাদত সম্পন্ন করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং সারাজীবন আল্লাহর আনুগত্যে অবিচল থাকার মধ্যেই রয়েছে। ইমান, তাকওয়া, নামাজ, পবিত্রতা, হালাল-হারাম মেনে চলা, প্রয়োজনীয় দ্বীনি জ্ঞান অর্জন, উত্তম চরিত্র গঠন, পরিবার ও সমাজের হক আদায় এবং নিয়মিত তওবা— এসবই একজন মুমিনের জীবনের অবিচ্ছেদ্য দায়িত্ব।

মহান আল্লাহ আমাদের নারী-পুরুষ সকলকে কুরআন ও সহিহ সুন্নাহর আলোকে জীবন পরিচালনার তৌফিক দান করুন, আমাদের আমল কবুল করুন এবং ইমানের উপর অবিচল রেখে উত্তম পরিণতি দান করুন।

رَبَّنَا تَقَبَّلْ مِنَّا إِنَّكَ أَنْتَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ

উচ্চারণ: ‘রব্বানা তাকাব্বাল মিন্না ইন্নাকা আংতাস সামিউল আলিম।’

অর্থ: ‘হে আমাদের রব! আমাদের পক্ষ থেকে (এ আমল) কবুল করুন। নিশ্চয়ই আপনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।’ (সুরা আল-বাকারা: আয়াত ১২৭) আল্লাহুম্মা আমিন।



সম্পর্কিত খবর