ধর্ম

যে আল্লাহর উপর ভরসা করে সে কখনও একা নয়!

নিউজ ডেস্ক

শেয়ারঃ

যে আল্লাহর উপর ভরসা করে সে কখনও একা নয়!

মানুষের জীবনে এমন অনেক মুহূর্ত আসে, যখন চারপাশের সব দরজা বন্ধ মনে হয়। পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়, আপনজন দূরে সরে যায়, আর ভবিষ্যৎ অন্ধকারে ঢেকে যায়। ঠিক সেই সময় একজন মুমিনের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো তাওয়াক্কুল—আল্লাহর উপর পূর্ণ আস্থা ও নির্ভরতা। তাওয়াক্কুল মানে শুধু মুখে ‘আল্লাহর উপর ভরসা করি’ বলা নয়; বরং নিজের সাধ্যের সর্বোচ্চ চেষ্টা করে ফলাফলের দায়িত্ব আল্লাহর হাতে সঁপে দেওয়া। যে হৃদয় আল্লাহর উপর ভরসা করতে শেখে, সে কখনো প্রকৃত অর্থে একা হয় না।


আল্লাহর উপর ভরসা—মুমিনের সর্বশ্রেষ্ঠ শক্তি

হজরত ইউসুফ (আ.) জানতেন না, তার জন্য বন্ধ দরজাগুলো অলৌকিকভাবে খুলে যাবে। কিন্তু তিনি জানতেন, আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য পাপ থেকে দূরে থাকা জরুরি। তাই তিনি কোনো আপস করেননি; বরং আল্লাহর আশ্রয় চেয়ে পাপ থেকে বাঁচার জন্য দৌড়ে গিয়েছিলেন।

হজরত মুসা (আ.)ও জানতেন না, বিশাল সমুদ্র চিরে তাদের জন্য রাস্তা তৈরি হবে। সামনে উত্তাল সাগর, পেছনে ফেরাউনের বিশাল বাহিনী—মানবীয় বিচারে মুক্তির কোনো পথ ছিল না। তবুও তিনি নির্ভয়ে এগিয়ে গেলেন, কারণ তার বিশ্বাস ছিল—আল্লাহ কখনো তার বান্দাকে অসহায় অবস্থায় ছেড়ে দেন না।


তারা কেউই জানতেন না কীভাবে আল্লাহ সাহায্য করবেন; কিন্তু তারা নিশ্চিত ছিলেন— আল্লাহ অবশ্যই সাহায্য করবেন। এটাই প্রকৃত তাওয়াক্কুল। আল্লাহ তাআলা বলেন—

وَمَن يَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ فَهُوَ حَسْبُهُ ۚ إِنَّ اللَّهَ بَالِغُ أَمْرِهِ ۚ قَدْ جَعَلَ اللَّهُ لِكُلِّ شَيْءٍ قَدْرًا

‘আর যে ব্যক্তি আল্লাহর উপর ভরসা করে, তার জন্য তিনিই যথেষ্ট। নিশ্চয়ই আল্লাহ তার কাজ পূর্ণ করে থাকেন। আল্লাহ প্রত্যেক বস্তুর জন্য একটি নির্ধারিত পরিমাপ স্থির করে রেখেছেন।’ (সুরা আত-তালাক: আয়াত ৩)


তাওয়াক্কুলের প্রকৃত শিক্ষা

অনেকেই মনে করেন, তাওয়াক্কুল মানে চেষ্টা না করে শুধু অপেক্ষা করা। অথচ ইসলাম তা শিক্ষা দেয় না। প্রকৃত তাওয়াক্কুল হলো—সর্বোচ্চ চেষ্টা করা, তারপর ফলাফলের ব্যাপারে আল্লাহর ফয়সালার উপর সন্তুষ্ট থাকা। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—

لَوْ أَنَّكُمْ تَتَوَكَّلُونَ عَلَى اللَّهِ حَقَّ تَوَكُّلِهِ لَرَزَقَكُمْ كَمَا يَرْزُقُ الطَّيْرَ، تَغْدُو خِمَاصًا وَتَرُوحُ بِطَانًا

‘তোমরা যদি আল্লাহর উপর যথার্থভাবে ভরসা করতে, তবে তিনি তোমাদেরকে এমনভাবে রিজিক দিতেন, যেমন তিনি পাখিদের রিজিক দেন। তারা সকালে খালি পেটে বের হয় এবং সন্ধ্যায় ভরা পেটে ফিরে আসে।’ (তিরমিজি ২৩৪৪)

লক্ষ্য করুন, পাখিরা বাসায় বসে থাকে না; তারা খাদ্যের সন্ধানে বের হয়। অর্থাৎ চেষ্টা ও তাওয়াক্কুল—দুটিই একসঙ্গে চলতে হবে।


মুমিনের হৃদয়ে ভয় নয়, ভরসা থাকে

জীবনের কঠিন সময়ে মানুষের চোখে যেখানে অন্ধকার, একজন মুমিন সেখানে আল্লাহর রহমতের আলো দেখতে শেখে। কারণ সে জানে—

  1. আল্লাহর পরিকল্পনা মানুষের পরিকল্পনার চেয়ে উত্তম।
  2. আল্লাহ কখনো তার বান্দাকে নিরাশ করেন না।
  3. প্রতিটি কষ্টের পর রয়েছে স্বস্তি।
  4. প্রতিটি পরীক্ষার মধ্যেই রয়েছে কল্যাণ, যদি বান্দা ধৈর্য ও তাওয়াক্কুল অবলম্বন করে। আল্লাহ তাআলা বলেন—

إِنَّ مَعَ الْعُسْرِ يُسْرًا ۝ إِنَّ مَعَ الْعُسْرِ يُسْرًا

‘নিশ্চয়ই কষ্টের সাথেই রয়েছে স্বস্তি। নিশ্চয়ই কষ্টের সাথেই রয়েছে স্বস্তি।’ (সুরা আলাম নাশরাহ: আয়াত ৫–৬)


জীবনের প্রতিটি পরীক্ষায় মনে রাখুন— আমরা ভবিষ্যৎ জানি না, কিন্তু ভবিষ্যতের মালিককে জানি। তাই হতাশা নয়, ভয় নয়; বরং আল্লাহর উপর অটল ভরসা রাখুন। হজরত ইউসুফ (আ.)-এর মতো পাপ থেকে দূরে থাকুন, হজরত মুসা (আ.)-এর মতো সাহস নিয়ে সামনে এগিয়ে যান। যখন আপনার ভরসার কেন্দ্র আল্লাহ হন, তখন বন্ধ দরজাও খুলে যায়, অন্ধকার পথেও আলো জ্বলে ওঠে, আর অসম্ভব বলে মনে হওয়া বিষয়ও তার ইচ্ছায় সম্ভব হয়ে যায়। আল্লাহর উপর ভরসা করুন— কারণ যে আল্লাহর উপর ভরসা করে, সে কখনও একা নয়।



সম্পর্কিত খবর