আন্তর্জাতিক

ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে কতদিন টিকতে পারে ইসরাইল

আলজাজিরা।

শেয়ারঃ

ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে কতদিন টিকতে পারে ইসরাইল

ছবি : সংগৃহীত

দখলদার ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্র যৌথভাবে ইরানে হামলা চালিয়ে পুরো মধ্যপ্রাচ্যে আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারির ওই আগ্রাসনের পর হাতের মুষ্ঠি ছেড়ে দিয়েছে তেহরানও। ঝাঁকে ঝাঁকে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ছুড়ছে উগ্র ইহুদিবাদী ভূখণ্ড ও উপসাগরীয় দেশগুলোয় মার্কিন স্বার্থসংশ্লিষ্ট স্থাপনা লক্ষ্য করে।


এই ক্ষেপণাস্ত্র বৃষ্টি মোকাবিলা করতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের ইন্টারসেপ্টরের মজুদ ফুরিয়ে আসছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে আসছে। এমতাবস্থায় ইরানের বিরুদ্ধে তেল আবিব কতদিন টিকতে পারবে- তা নিয়ে চলছে বিভিন্ন ধরনের বিশ্লেষণ-গবেষণা।


ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের নেতারা ইঙ্গিত দিয়েছেন যে ইরানের বিরুদ্ধে এই সংঘাত আরও কয়েক সপ্তাহ চলতে পারে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বে যুক্তরাষ্ট্র জোর দিয়ে বলেছে যে এটি কোনো সমস্যা হবে না এবং দীর্ঘস্থায়ী লড়াই চালানোর সক্ষমতা তাদের সামরিক বাহিনীর আছে। কিন্তু ইসরাইলের জন্য—যারা ইতোমধ্যে গাজায় গণহত্যা চালানোর খরচ, সেইসঙ্গে লেবানন ও সিরিয়ায় যুদ্ধ বা হামলা এবং ইরানের সঙ্গে আগের দফার সংঘাতে ক্লান্ত—একটি দীর্ঘায়িত সংঘাত আরও ব্যয়বহুল হতে পারে।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে হামলা চালানোর পর থেকে ইসরাইল ক্রমাগত ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার শিকার হচ্ছে। এ কারণে ব্যাপক বিমান হামলার সতর্কবার্তা (এয়ার রেইড অ্যালার্ট), স্কুল বন্ধ রাখা এবং হাজার হাজার রিজার্ভ সৈন্যকে তলব করতে বাধ্য হয়েছে যুদ্ধবাদী সরকার।

হাইফা ও তেল আবিবের মতো শহরগুলো টানা হামলার মুখে পড়েছে, জরুরি পরিষেবাগুলো হিমশিম খাচ্ছে। দেশটির সাধারণ মানুষ, যারা তাদের সরকার অন্যদের ওপর যে মাত্রার যুদ্ধ চাপিয়ে দেয় তাতে অভ্যস্ত নয়, তারা গত কয়েকদিন ধরে বোমা আশ্রয়কেন্দ্রে (বম্ব শেল্টার) আসা-যাওয়ার মধ্যে আছেন।


আপাতত যুদ্ধের প্রতি জনসমর্থন বেশ তুঙ্গে। প্রধান শহরগুলোর ইসরাইলিদের সাক্ষাত্কারে এমন এক শত্রুর মোকাবিলা করার আকাঙ্ক্ষা দেখা গেছে, যাদের সম্পর্কে কয়েক দশক ধরে জনগণকে বলা হয়েছে যে তারা ইসরাইলকে নির্মূল করতে বদ্ধপরিকর।

কট্টর বামপন্থীরা ছাড়া প্রায় সব রাজনীতিবিদই সরকারের পতাকাতলে ঐক্যবদ্ধ হয়েছেন।

ইসরাইলি রাজনৈতিক অর্থনীতিবিদ শির হেভার বলেন, যুদ্ধ শুরু হওয়ার সঙ্গেই ইসরাইলজুড়ে সামরিকবাদের এক জোয়ার বয়ে গেছে।

তিনি আরও বলেন, এটি গত বছরের ১২ দিনের যুদ্ধের মতো ছিল না। তখন ছিল মূলত আতঙ্ক এবং এক অস্তিত্ব রক্ষার ভয় যে ইরান হয়তো ইসরাইলকে ধ্বংস করে দেবে। এখন এটি এক উন্মাতাল সামরিকবাদ এবং অতি-আত্মবিশ্বাস। এমনকি যুদ্ধের সামান্য সমালোচক যারা আছেন, তারাও প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুকে যুদ্ধ ‘সংক্ষিপ্ত’ রাখার পরামর্শ দিচ্ছেন—যেন ইসরাইল নিজেই ঠিক করতে পারে যে এটি কখন শেষ হবে।


যুদ্ধের প্রতি এই সমর্থনকে অনেকেই ইসরাইলি সমাজের একটি কট্টরপন্থায় রূপান্তর হিসেবে দেখছেন। আগে যারা প্রান্তিক পর্যায়ের কট্টর দক্ষিণপন্থী রাজনীতিবিদ ছিলেন, তারা এখন সরকারের মূল কেন্দ্রে চলে এসেছেন। রাজনৈতিক মেরুকরণ এবং অর্থনৈতিক চাপের কারণে তরুণ ও মেধাবীদের দেশত্যাগের গতি আরও ত্বরান্বিত হয়েছে।

যারা দেশে আছেন, তারা আগে থেকেই ইরানকে তাদের দেশের প্রধান শত্রু হিসেবে ভাবতে অভ্যস্ত। কয়েক সপ্তাহের যুদ্ধ সমাজকে আরও বেশি সামরিকিকরণ (মিলিটারাইজ) করতে পারে।

তেল আবিব বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ড্যানিয়েল বার-তাল বলেন, এটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যুক্তরাজ্যের ‘ব্লিৎজ’ (লন্ডন বোমা হামলা) এর মতো। তখন ব্রিটিশরা এই বোমাবর্ষণ মেনে নিয়েছিল, কারণ তারা মনে করত তারা এক চরম অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে লড়ছে। ইসরাইলিদের অনুভূতিও একই রকম। জন্মের পর থেকেই আমাদের মগজধোলাই করা হয় যে ইরান হলো অশুভ শক্তি; কিন্ডারগার্টেন, হাই স্কুল এবং সেনাবাহিনীতে এই ধারণাই আরও পোক্ত করা হয়।

বার-তালের মতে, কয়েক সপ্তাহের নতুন যুদ্ধের পর ইসরাইলি সমাজ ঠিক কোন দিকে মোড় নেবে তা অনুমান করা অসম্ভব। তবে তিনি উল্লেখ করেন যে, ১৯৪৮ সালের ‘নাকবা’র সময়কার হত্যাকাণ্ড কিংবা সাম্প্রতিক গাজা গণহত্যা—কোনোটিই দেশটির শাসনব্যবস্থার ন্যায়পরায়ণতা সম্পর্কে তাদের নৈতিক দৃঢ়তায় ফাটল ধরাতে পারেনি।

তিনি বলেন, এখন আমাদের কাছে এমন এক প্রজন্ম আছে, যারা আরও বেশি সামরিকবাদী এবং কট্টর ডানপন্থী। নেতানিয়াহু আমাদের বলছেন যে এখন আমাদের তলোয়ারের ওপর ভর করেই বাঁচতে হবে।


বোমা ও বন্দুক

সামাজিক প্রভাবের বাইরেও, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে ইসরাইলকে বেশ কিছু সামরিক হিসাব-নিকাশ মাথায় রাখতে হবে।

সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো—ইরানের মতো বিশাল আকার ও সামরিক শক্তির প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে ইসরাইল কতদিন বর্তমান স্তরের যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারবে- তা নির্ধারণ করা। প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক হামজে আত্তারের মতে, এটি নির্ভর করবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের মতো মিত্রদের কাছ থেকে পাওয়া সমর্থনের ওপর এবং ইরানের আগে ইসরাইলের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নিঃশেষ হয়ে যায় কিনা তার ওপর।

তিনি বলেন, যুদ্ধের প্রথম তিন দিনে ইরান ইসরাইলের দিকে ২০০টিরও বেশি ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে। প্রেক্ষাপট বিবেচনায় বললে, ১২ দিনের যুদ্ধের সময় তারা প্রায় ৫০০টি ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছিল, যার প্রতিটির বিপরীতে ইসরাইলকে একটি করে ইন্টারসেপ্টর রকেট ছুড়তে হয়েছিল। এটি সম্ভবত ইসরাইলের মোকাবিলা করার ক্ষমতার চেয়েও বেশি। ফলে মার্কিন সাহায্য ছাড়া ইসরাইল সম্ভবত এতক্ষণে তাদের আকাশসীমার নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলত।

ইসরাইলের তিন ধরনের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আছে: স্বল্পপাল্লার রকেট ও কামানের গোলার জন্য ‘আয়রন ডোম’; মাঝারি পাল্লার রকেট ও ক্রুজ মিসাইল মোকাবিলার জন্য ‘ডেভিডস স্লিং’; এবং ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করার জন্য ‘অ্যারো ২’ ও ‘অ্যারো ৩’।

ইসরাইলিরা তাদের মজুত থাকা ইন্টারসেপ্টর বা প্রতিরোধক মিসাইলের সংখ্যা প্রকাশ করে না। তবে ১২ দিনের যুদ্ধের সময় তাদের মজুত কমতে শুরু করেছিল। এটি ইঙ্গিত দেয় যে, যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে উচ্চমাত্রার প্রতিরক্ষা বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়বে। এর ফলে ইন্টারসেপ্টর ব্যবহারে কৃচ্ছ্রতা বা রেশনিং শুরু হতে পারে এবং সামরিক ও রাজনৈতিক লক্ষ্যবস্তু রক্ষার ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হতে পারে, যা বেসামরিক হতাহতের সংখ্যা বাড়িয়ে দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করবে।

আত্তার বলেন, ইসরাইলি ও মার্কিন সূত্র অনুযায়ী ইরান গত জুনের সংঘাতের পর থেকে প্রতি মাসে ১০০টি করে ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করছে, যা নির্দেশ করে যে তেহরান ইতোমধ্যেই বিশাল এক মজুত গড়ে তুলেছে।

তবে আত্তার দ্রুতই উল্লেখ করেন যে, ইরানি হুমকি তাদের কাছে থাকা ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের ধরনের ওপরও নির্ভর করে। ক্ষেপণাস্ত্রের ধরনগুলো বিশ্লেষণ করে তিনি বলেন, আমরা জানি না ঠিক কোন ধরনের ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তাদের কাছে আছে। দীর্ঘ পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র গ্রিস ও ভূমধ্যসাগর পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে; মাঝারি পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ইসরাইলে পৌঁছাতে পারে; আর স্বল্প পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রগুলো উপসাগরীয় দেশগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করতে পারে।

তিনি আরও বলেন, তেমনিভাবে আমরা জানি না ১২ দিনের যুদ্ধের আগে ইরানের কতগুলো ক্ষেপণাস্ত্র ছিল, সেই যুদ্ধে কতগুলো ধ্বংস হয়েছে বা তাদের কতগুলো লঞ্চার (ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপক) আছে। আপনার কাছে যদি পর্যাপ্ত লঞ্চার না থাকে—যা বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল লক্ষ্যবস্তু করছে—তবে আপনার কতগুলো ক্ষেপণাস্ত্র আছে তা কোনো গুরুত্ব রাখে না। এটি অনেকটা রাইফেল ছাড়া গুলির মতো।


অর্থনৈতিক বিবেচনা

বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন যে, দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা প্রায় নিরবচ্ছিন্ন যুদ্ধ ইসরাইলের অর্থনীতির ওপর ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে। গোলাবারুদের খরচ এবং পরিকল্পনার চেয়েও অনেক বেশি সময় ধরে কয়েক লাখ রিজার্ভ সৈন্য মোতায়েন রাখা ইসরাইলি কোষাগারের ওপর বিশাল চাপ তৈরি করেছে।

২০২৪ সালে লেবানন ও গাজা যুদ্ধে ইসরাইলের ব্যয় ৩১ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে বলে জানা গেছে, যা দেশটিকে গত কয়েক বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ বাজেট ঘাটতির মুখে ফেলেছে। ২০২৫ সালের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ ব্যয় ৫৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে।

অর্থনীতির ওপর এই চাপের কারণে ২০২৪ সালে প্রধান তিনটি ক্রেডিট রেটিং সংস্থাই ইসরাইলের সার্বভৌম ক্রেডিট রেটিং কমিয়ে দিয়েছে। রাষ্ট্রীয় অর্থনীতিবিদ হেভার বলেন, ইসরাইল বর্তমানে ঋণ সংকট, জ্বালানি সংকট, পরিবহন সংকট এবং স্বাস্থ্যসেবা সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।

তবে এই রাজনৈতিক অর্থনীতিবিদ সতর্ক করে বলেছেন, এর কোনোটিই ইসরাইলের সামরিক অভিযান বন্ধ করার জন্য যথেষ্ট নয়। তিনি বলেন, এটি অর্থনীতির প্রশ্ন নয়, বরং প্রযুক্তির প্রশ্ন।

তার মতে, যুক্তরাষ্ট্র যদি ইসরাইলকে এমন উন্নত অস্ত্র সরবরাহ অব্যাহত রাখে, যা নিজেই লোড হতে পারে, নিজেই লক্ষ্য নির্ধারণ করতে পারে এবং এত দূর থেকে লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করতে পারে যে সেনাদের জীবন ঝুঁকির মুখে না পড়ে, তবে ইসরাইলের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সংকট তাদের আগ্রাসন বন্ধ করার জন্য যথেষ্ট হবে বলে আমি মনে করি না।


সম্পর্কিত খবর