সারাদেশ

ঈদের রাতে বিএনপি নেতা মিন্টুর ‘সিক্স স্টার’ বাহিনীর তাণ্ডব

স্টাফ রিপোর্টার

শেয়ারঃ

ঈদের রাতে বিএনপি নেতা মিন্টুর ‘সিক্স স্টার’ বাহিনীর তাণ্ডব

ছবি : সংগৃহীত

সন্ত্রাসের জনপদ হিসেবে খ্যাত রাজশাহীর বাগমারা কিছুদিন শান্ত থাকলেও আবারও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে।

অভিযোগ উঠেছে, বাগমারার তাহেরপুর পৌরসভা বিএনপির সভাপতি আ ন ম শামছুর রহমান মিন্টুর মদদে গড়ে উঠেছে ‘সিক্স স্টার’ নামে এক ভয়ঙ্কর সশস্ত্র সন্ত্রাসী বাহিনী।

রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর এ বাহিনীর চাঁদাবাজি, পুকুর, জমি ও হাটবাজার দখল এবং নির্যাতনে ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়েছেন এলাকার মানুষ। শুধু সাধারণ মানুষই নয়, এ বাহিনীর হামলা থেকে রক্ষা পাচ্ছেন না বিএনপি এবং অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীরাও।


গত ২১ মার্চ শনিবার ঈদুল ফিতরের রাতে যুবলীগ ও ছাত্রলীগের তিন নেতাকর্মীর বাড়িতে ব্যাপক ভাঙচুর ও লুটপাট চালিয়েছে মিন্টু বাহিনী। এরমধ্যে দুটি বাড়ির প্রায় সব আসবাবপত্র ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। প্রকাশ্যে পিস্তল উঁচিয়ে এবং গলায় হাঁসুয়া ধরে লুট করা হয়েছে নগদ টাকা ও স্বর্ণালঙ্কার।

ঈদের দিন রাত সাড়ে ১০টা থেকে ১২টা পর্যন্ত বাগমারার তাহেরপুর পৌরসভার নূরপুর মহল্লার বাড়ি তিনটিতে এই নারকীয় তাণ্ডব চলে।

এরপর বিএনপি নেতা মিন্টুর ক্যাডাররা টার্গেট করে করে তাহেরপুর এবং পার্শ্ববর্তী শ্রীপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় আওয়ামী লীগ ও অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীদের বাড়িতে বাড়িতে হানা দেয়। এ সময় তারা এসব এলাকায় প্রকাশ্যে আগ্নেয়াস্ত্র এবং দেশীয় অস্ত্র দেখিয়ে চরম ভীতিকর পরিবেশ তৈরি করে। ১২ থেকে ১৫ জনের জন সশস্ত্র দলটি মাইক্রোবাসে চড়ে তাহেরপুর ও শ্রীপুর ইউনিয়নের অলিগলিতে রাতভর মহড়া দেয়।


তবে পরিকল্পিত এ তাণ্ডবের আগে তাহেরপুর পৌর সদরের হরিতলা মোড়ে যুবলীগ নেতা সোহেল রানার চেম্বারে ঈদের দিন বিকালে বিশেষ বৈঠক করেন মিন্টু ও তার বাহিনী। এ সময় তার সঙ্গে ছিলেন- কৃষক দল নেতা রাসেল ফরাসি, ছাত্রদল নেতা সোহেল রানা, স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা আশরাফুল পেয়াদা, তাহেরপুর পৌরসভার পাঁচ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর শমসের আলী, সাত নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি মিজানুর রহমান মজনুসহ নেতাকর্মীরা। এ ধরনের কয়েকটি ছবি এবং অডিও ভয়েসসহ সব প্রমাণাদি যুগান্তরের হাতে এসেছে।

নির্যাতিত ব্যক্তিদের অভিযোগ, এ বৈঠকেই তাদের বাড়িঘরে হামলা এবং লুটের পরিকল্পনা করা হয়। এরপর ওই রাতেই চালানো হয় তাণ্ডব। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন বিএনপি নেতা মিন্টু।


রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর মিন্টুর বাহিনী তাহেরপুর পৌরসভার হরিতলা মোড়ের সোহেলের চেম্বারটি দখল করে নেন। বাড়িঘর ভাঙচুর, লুট এবং ভয়ভীতি দেখানোর ঘটনায় যুবলীগ নেতা সোহেলের বাবা আব্দুল গাফ্ফার রোববার (২২ মার্চ) সন্ধ্যায় বাগমারা থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন।

জিডিতে আব্দুল গাফ্ফার পাঁচজনের নাম উল্লেখ করেছেন। তারা হলেন- তাহেরপুর পৌরসভা স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্য সচিব আশরাফুল পেয়াদা, তাহেরপুর পৌরসভা কৃষক দলের সিনিয়র সহসভাপতি রাসেল ফরাসি, তাহেরপুর পৌরসভা ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক সোহেল রানা, পৌরসভা যুবদলের সদস্য জুয়েল রানা এবং তাহেরপুর কলেজ ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক শাকিল।

এছাড়া জিডিতে আরও অজ্ঞাত পাঁচ থেকে থেকে সাতজন ব্যক্তির সম্পৃক্ততার বিষয়টি উল্লেখ রয়েছে। তাদের মধ্যে আশরাফুল পেয়াদা, রাসেল ফরাসি এবং জুয়েল রানা আলোচিত বিএনপি নেতা মিন্টুর ‘সিক্স স্টার’ বাহিনীর অন্যতম সদস্য। ঘটনার সময় দুজনের হাতেই পিস্তল ছিল বলে জানিয়েছেন নির্যাতিত পরিবারের সদস্যরা।

নূরপুর মহল্লার নির্যাতিত আব্দুল গাফ্ফার বলেন, শনিবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে আশরাফুল পেয়াদা, রাসেল ফরাসি এবং জুয়েল রানার নেতৃত্বে ১২-১৪ জনের একটি সশস্ত্র দল আমাদের বাড়িতে আসেন। এরপর বাড়ির মূল ফটক ধাক্কাধাক্কি শুরু করেন। তারা জোর করে বাড়িতে প্রবেশ করে খাট, টেবিল, আলমারি, টেলিভিশন, ফ্রিজ, এসিসহ বাড়ির প্রায় সব আসবাবপত্র ভেঙে গুঁড়িয়ে দেয়।


তিনি বলেন, সন্ত্রাসীরা আমার ছেলে সোহেলকে না পেয়ে পিস্তল বের করে এবং দেশীয় অস্ত্র প্রদর্শন করে চরম ভীতিকর পরিবেশ সৃষ্টি করে। এ সময় রাসেল ফরাসি এবং জুয়েল রানা আমার মাথায় পিস্তল ধরেন এবং অন্য সন্ত্রাসীরা গলায় হাঁসুয়া ধরে বাড়িতে টাকা এবং স্বর্ণালঙ্কার থাকলে বের করে দিতে বলেন। আমার এবং পরিবারের সদস্যদের জীবন বাঁচাতে বাধ্য হয়ে আড়াই লাখ টাকা মূল্যের স্বর্ণালঙ্কার ও নগদ ৫৫ হাজার টাকা তাদের হাতে তুলে দিতে বাধ্য হয়েছি।


এরপর পাশেই ছাত্রলীগ কর্মী ফরিদ ইসলামের বাড়িতে হামলা চালায় বিএনপি নামধারী সন্ত্রাসীরা। তারা ফরিদের বাড়িতে ব্যাপক ভাঙচুর চালায়। তার বাড়িতে ঈদের আগে গরু বিক্রি করা দুই লাখ টাকা ছিল। সেটি লুট করে নিয়ে যায় সন্ত্রাসীরা। এরপর হামলাকারীরা আরেক ছাত্রলীগ কর্মী শামীম ওসমানের বাড়িতে ঢুকতে না পেরে বাইরে থেকে ভাঙচুর চালিয়ে চলে যান।

এদিকে নির্যাতিত পরিবারের ব্যক্তিরা জানান, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর থেকে যুবলীগ নেতা সোহেল রানা আত্মগোপনে রয়েছেন। তার বিরুদ্ধে থানায় তিনটি মামলা রয়েছে। শামীম ওসমান ও ফরিদ এলাকায় আছেন। সোহেল রানার ছোট ভাই শিহাব আল সবুজ ছাত্রলীগের সমর্থক। অনার্স পরীক্ষার জন্য তিনি তাহেরপুর কলেজে ফরম পূরণ করতে যাওয়ায় ক্ষুব্ধ হয়ে বাড়িঘরে হামলা চালানো হয়েছে বলে নির্যাতিতদের অভিযোগ।


অজ্ঞাত স্থান থেকে যুবলীগ নেতা সোহেল মোবাইল ফোনে দাবি করেছেন, তাহেরপুর পৌর ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক সোহেল, পৌর কৃষক দলের সিনিয়র সহ-সভাপতি রাসেল ফরাসি, পৌর স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্য সচিব আশরাফুল পিয়াদা, পৌর যুবদলের নেতা জুয়েল রানা ও তাহেরপুর কলেজ ছাত্রদলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক মো. শাকিলের নেতৃত্বে ১২ থেকে ১৪ জন নেতাকর্মী ব্যাপক তাণ্ডব ও ভাঙচুর চালিয়েছেন, লুট করেছেন। হামলার সময় রাসেল ফরাসি ও জুয়েলের হাতে পিস্তল ছিল। আর অন্যদের হাতে হাঁসুয়া, রামদা, পাইপসহ দেশীয় অস্ত্র ছিল বলে তার দাবি।


ঘটনার পর সোহেল রানা মোবাইল ফোনে কথা বলেন রাসেল ফরাসির সঙ্গে। তাদের কথোপকথনে তাহেরপুর পৌর বিএনপির সভাপতি ও সাবেক পৌর মেয়র আ ন ম সামছুর রহমান মিন্টুর নির্দেশে বাড়িগুলোতে ভাঙচুরের বিষয়টি উঠে এসেছে।

সোহেল রানা বিএনপি নেতা মিন্টুর কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘তোমাদের বসের সঙ্গে একটা বিষয়ে কথাবার্তা হচ্ছে, তুমি কি জানো?’ এ সময় রাসেল ফরাসি বলেন, ‘তাহলে আমাদের পাঠাল কেন?’


অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে কিছুই জানেন না বলে দাবি করেছেন তাহেরপুর পৌর কৃষক দলের সিনিয়র সহসভাপতি রাসেল ফরাসি। তিনি বলেন, আমি এসব বিষয়ে কিছুই জানি না। তাই আমি কোনো মন্তব্য করব না।

যুবলীগ নেতা সোহেলের সঙ্গে তার ফোনকল রেকর্ডের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি দাবি করেন, সোহেলের সঙ্গে তার কোনো কথা হয়নি।

অপরদিকে যুবলীগ এবং ছাত্রলীগের তিন নেতার বাড়িতে ব্যাপক হামলা এবং লুটপাটের পর পৌরসভার ৮ নাম্বার ওয়ার্ডের আত্মগোপনে থাকা ছাত্রলীগ নেতা শাহীন আলম, একই ওয়ার্ডের ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক কুরবান খাঁ, পাঁচ নাম্বার ওয়ার্ড পৌর যুবলীগের সদস্য রুবেল হক এবং পার্শ্ববর্তী শ্রীপুর ইউনিয়নের ১ নাম্বার ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি আতিকুর রহমান স্বপনসহ ১৫ থেকে ২০টি বাড়িতে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের খোঁজ করা হয়। এ সময় বিএনপি নেতা মিন্টুর বাহিনীর সদস্যরা আত্মগোপনে থাকা নেতাকর্মীদের পরিবারের সদস্যদের ব্যাপক ভয়ভীতি দেখান এবং চরম আতঙ্কের সৃষ্টি করেন।

আতঙ্ক এবং নিরাপত্তাহীনতার কারণে নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক তাহেরপুরের বিএনপি এবং অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীরা জানান, বিএনপি নেতা মিন্টুর নেতৃত্বাধীন ‘সিক্স স্টার’ বাহিনীর সদস্যদের বেপরোয়া সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড, ব্যাপক চাঁদাবাজি, পুকুর খনন এবং জমি ও দোকান দখলসহ নানা অপকর্মে সাধারণ মানুষ চরম নিরাপত্তাহীনতায় রয়েছেন। আর এসবের মাধ্যমে মিন্টু রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর নিঃস্ব অবস্থা থেকে অন্তত অর্ধশত কোটি টাকার মালিক হয়েছেন।

বিএনপি নেতা মিন্টুর বহুল আলোচিত এ ‘সিক্স স্টার’ বাহিনীর সদস্যরা হলেন- তাহেরপুর পৌর কৃষক দলের সিনিয়র সহ-সভাপতি রাসেল ফরাসি, পৌরসভা যুবদলের সদস্য জুয়েল রানা, তাহেরপুর পৌর ছাত্রদলের বর্তমান সহ-সভাপতি সোহেল রানা, পৌরসভা স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্য সচিব আশরাফুল পেয়াদা, তাহেরপুর পৌর ছাত্রদলের বর্তমান সহ-সভাপতি আবুল বাশার এবং তাহেরপুর ডিগ্রি কলেজের ছাত্রদলের সাবেক আহ্বায়ক আবুল বাশার।

গত বছরের ১ ডিসেম্বর ‘সিক্স স্টার’ বাহিনীর সদস্যরা তাহেরপুর পৌরসভা সদরে জেলা যুবদলের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এসএম আরিফুল ইসলামের চাইনিজ রেস্টুরেন্টে ব্যাপক তাণ্ডব চালিয়ে ভাঙচুর করে। আরিফকে চাপাতি দিয়ে নৃশংসভাবে কোপানো হয়, পেটানো হয় রড দিয়ে। আরিফ কোনো রকমে পালিয়ে জীবন বাঁচান। এ সময় যুবদল নেতা আরিফের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে তিনি তার ওপর হামলা ও রেস্টুরেন্টে ভাঙচুরের পেছনে তাহেরপুর পৌর বিএনপির সভাপতি মিন্টুর মদদ রয়েছে বলে উল্লেখ করেন।


এদিকে গত ২৩ জানুয়ারি সেনাবাহিনীর একটি অভিযানিক দল বাগমারায় অভিযান চালিয়ে আলোচিত ‘সিক্স স্টার’ বাহিনীর দুই সদস্য বাশার ও হালিমকে একটি পয়েন্ট ২২ বোরের এয়ার রাইফেল ও একটি আধুনিক ওয়াকিটকিসহ আটক করে। তাদের অস্ত্রসহ বাগমারা থানা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

তবে বাগমারা থানা পুলিশ তাদের বিরুদ্ধে কোনো মামলা না করে শুধু ৫৪ ধারায় সন্দেহমূলক গ্রেফতার প্রতিবেদন দিয়ে আদালতে পাঠায়। ওইদিন শুক্রবার হওয়ায় এক ঘণ্টার নোটিশে বিশেষ আদালত বসিয়ে তাদের জামিনে ছেড়ে দেওয়া হয়। সন্ধ্যার মধ্যেই তারা নিজ নিজ এলাকায় ফেরেন।

তবে এলাকাবাসী জানান, হালিম এবং বাশার তাদের অপকর্ম বুঝতে পেরে ইতোমধ্যে ‘সিক্স স্টার’ বাহিনী ত্যাগ করেছেন।

এদিকে সব অভিযোগ অস্বীকার করে তাহেরপুর পৌরসভা বিএনপির সভাপতি ও সাবেক পৌর মেয়র আ ন ম শামছুর রহমান মিন্টু বলেন, যুবলীগ নেতা সোহেলের চেম্বার দখলের অভিযোগ সঠিক না। আমি শুনেছি, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ সংঘটিত হচ্ছে। তবে হামলার বিষয়ে আমি কিছু জানি না। আর হামলা যদি হয়ে থাকে, এর সঙ্গে আমার কোনো যোগসূত্র নেই। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বিষয়টির খোঁজ নিলেই এর সত্যতা পাবে। কেউ সম্পৃক্ত থাকলে আইনের আওতায় আসবে। আইন তার নিজস্ব গতিতে চলবে।

বাড়িঘরে হামলা ও লুটের ব্যাপারে বাগমারা থানার ওসি সাইদুল আলম বলেন, কেউ জিডি করেছেন কিনা জানা নেই। যদি জিডি করে থাকেন এবং ঘটনা ঘটে, তাহলে তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


সম্পর্কিত খবর